দ্রুত এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে রাজধানীসহ দেশের শহরগুলোতে বায়ু এবং পানি দূষণ বাড়ছে। শুধু বায়ু দূষণের ফলে বছরে যে ক্ষতি হচ্ছে তার আর্থিক পরিমাণ মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) এক শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শহরের দূষণ বৃদ্ধির ফলে শিশুদের আইকিউ বা মেধার বিকাশ কমে যাচ্ছে, স্নায়বিক অসুখের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশের অবস্থা মূল্যায়ন করে এক খসড়া প্রতিবেদনের উপর গতকাল আয়োজিত কর্মশালায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংক আয়োজিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশতিয়াক আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল, বিশ্বব্যংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. জাহিদ হোসেন বক্তব্য রাখেন। বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিভাগের প্রাকটিস ম্যানেজার ক্যাসেনিয়া লভস্কি এতে স্বাগত বক্তব্য দেন।
খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে শহরের বায়ু এবং পানি দূষিত হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, মাত্র এক টন কাপড়ের রং এবং ফিনিশিং এর জন্য কারখানাগুলো প্রায় ২০০ মেট্রিক টন তরল বর্জ্য নদীতে ফেলছে। এর ফলে দরিদ্র্র এবং নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ছোট-বড় সব ধরনের শহরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, পাবনা শহরে জলাভূমি ১৯৯০ সালের পর অর্ধেক হারিয়ে গেছে। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে দূষণের ফলে প্রায় ৬ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের জিডিপির ৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্নীতির কারণেও ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ৩ শতাংশ। এটা অবশ্যই উদ্বেগের। তিনি বলেন, পরিবেশে নিয়ে আমাদের একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে। যে কমিটির প্রধান হলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এর সমন্বয় করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এটি পদ্ধতিগতভাবে ঠিক আছে। কিন্তু এ কমিটির বৈঠক শেষে আমি যখন মন্ত্রণালয়ে আসি তখন দেখতে পাই, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ তারা কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভ্রুক্ষেপই করে না। তিনি বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় পুকুর খনন করে, কৃষি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ও পুকুর খনন করছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছে পুকুর ও খাল খননে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে এই টাকা দেওয়ার পরেও ৫০ ভাগ পুকুর খনন হয় না, ৭০ ভাগ খালও খনন হয় না। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দুর্নীতিকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলাগুলোর উন্নয়নে একটি কমিটি রয়েছে কিন্তু এই কমিটি স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কথার বাইরে যেতে পারে না। তিনি বলেন, আমি মনে করি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া অবশ্যই শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সবাই সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেন, কিন্তু কেউই ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের কথা বলেন না।
ভবিষ্যত্ প্রজন্মের বিষয়ে তিনি বলেন, যে শিশুটি রেললাইনের পাশে বড় হচ্ছে সে যদি ভালো ভবিষ্যত্ পায় তাহলে সে তার শৈশব ভুলে যাবে। কিন্তু তারা যদি জীবন মান পরিবর্তন করতে না পারে তাহলে তারা এই সমাজের বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নেবে, এটাই বাস্তবতা। নতুন প্রজন্ম দেশ গড়ছে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, নরসিংদীর রাস্তার দুইধারে প্রচুর শিল্প কারখানা তৈরি হয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগই পরিবেশবান্ধব। এর মূল কারণ হলো এখানকার বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই তরুণ এবং শিক্ষিত। তারা বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করছেন। তিনি বলেন, দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নয়, প্যারিস চুক্তির আলোকে ফ্রি অর্থ চাই।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করতে হবে। বর্তমানে ৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ শহরে বাস করছে। ২০১৫ সালের হিসাবে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূলের ৫৩ লাখ মানুষ।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশতিয়াক আহমেদ জানান, ইতোমধ্যে জাতীয় পরিবেশ নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে শিল্পায়নও করতে হবে সেইসাথে পরিবেশেরও সুরক্ষা করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মণ্ডল বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর মনিটরিং, একে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইত্তেফাক/নূহু
