হাথুরুসিংহের প্ল্যানিং, সবকিছু আপ টু দ্য মার্ক: মাশরাফি

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:৪০
বিপিএল শিরোপা জিততে চাও, অধিনায়ক মাশরাফিকে দলে নাও— গত কিছুদিনে প্রায় প্রবাদে রূপ নেয়া বাক্যটিকে অত্যুক্তি বলা যাবে না। টুর্নামেন্টের পাঁচ আসরের চারটিতেই শিরোপা জিতেছেন অধিনায়ক মাশরাফি। বৃহস্পতিবার নিজের বাসায় একান্ত সাক্ষাৎকারে বিপিএলের সাফল্য ও সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জান-ই-আলম।
 
হুমায়ারা, সাহেল কি বোঝে তাদের বাবা চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। কি বলেছে তারা শিরোপা জেতার পর?
 
হুমায়ারা একটু বোঝে। সাহেল শুধু বলে যে, জিতে গেছ নাকি হেরে গেছ। এটুকুই বলে। আর হুমায়ারা বলে যে, হেরে গেলে প্যাকেট করে বাইরে ফেলে দেব।
 
চারবার বিপিএল চ্যাম্পিয়ন হলেন। কোনটা বেশি স্পেশাল বা কোন আসরকে এগিয়ে রাখবেন?
 
এবারেরটা। তবে তৃতীয় বছরেরটাও অনেক কঠিন ছিল। প্রথম দুইটা সমানভাবে সহজ ছিল। কারণ প্রথমবার সেমিফাইনালে যখন আফ্রিদি, আজমলরা আসে তখন ওরা ফর্মের তুঙ্গে ছিল, তখন মনে হচ্ছিল এটা সম্ভব। দ্বিতীয়বারে আমাদের দলই ছিল ভালো। আমাদের ধারে কাছে কেউ ছিল না। স্থানীয়দের মধ্যে সাকিব ছিল, আমি, ইলিয়াস সানি তখন সেরা ছিল। পোলার্ড, গেইল, লুক রাইট, সব ফর্মের খেলোয়াড়রা ছিল। তৃতীয় বছর অনেক কঠিন ছিল। আর এবার দলের দিকে তাকালে আমাদেরটা সত্যিকার অর্থে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা নয়। ঢাকা, কুমিল্লার যে দল ছিল, তাদের ভারসাম্যপূর্ণ খুব ভালো ছিল। কিন্তু এ দুই বছরকেই এগিয়ে রাখবো।
 
বিপিএল শুরুর আগে বলেছেন, বসুন্ধরা অনেক সম্মান দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে নিশ্চয়ই তাদেরকে কিছুটা ফিরিয়ে দিতে পারলেন?
 
দেখেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তাদের যতটুকু দেখেছি, উনারা খুশি। আমি নিশ্চিত। তারপরও বিস্তারিত তারা হয়তো বলতে পারবেন। আমার দিক থেকে আমি বলতে পারি যে, তারা আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা এবং সম্মান দিয়েছে। এজন্য অবশ্যই তাদেরকে ধন্যবাদ।
 
বিপিএলে বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে কাদের পারফরম্যান্স আপনার নজর কেড়েছে?
 
আফিফ খুব ভালো। শান্ত (নাজমুল হোসেন) খুব সম্ভাবনাময়। আবু হায়দার রনি আবার ভালো করেছে। আবু জায়েদ রাহী ভালো করছে। আমি অবশ্যই জাতীয় দলের চিন্তা করে বলছি না। আমি বলছি, এরা ভালো করছে, এরা সম্ভাবনাময় এবং এদেরকে এখন থেকেই সেভাবে পরিচালনা করা উচিত। মিঠুন খুব ভালো করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। বিজয় কয়েকটা ম্যাচে খুব খেলেছে। যদিও ওর ব্যাটিং পজিশন খুব ভালো জায়গায় ছিল না। পরে যখন ওকে ওর নিজের পজিশনে আনা হয়েছে তখন খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। আরিফুল হক খুব ভালো খেলেছে। আমি যেটা বলছি, আপনি এখন এদেরকে কোন চোখে দেখছেন এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে মনে হয় এদেরকে সঠিক নিদের্শনা  দেয়া উচিত। এরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
 
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ছেড়ে এবার রংপুর রাইডার্সের হয়ে বিপিএল জিতলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুমিল্লা এবং আপনাকে নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিষয়টা কিভাবে দেখছেন?
 
আপনি যখন একটা টিম বানাবেন, আপনার পূর্ণ অধিকার আছে আপনার টিমকে সেরা বানানোর। সেক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই প্রথমে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে তাকাবেন না। আপনাকে টিম বানাতে হবে সম্ভাব্য সেরা খেলোয়াড় যারা আছে তাদেরকে চিন্তা করেই। এবং তারা অনেক টাকা খরচ করেছে এবার। আপনি যদি দলের দিকে তাকান। সেখানে তারা আমার জায়গায় নিয়েছে তামিমকে। এবং তামিম হচ্ছে বাংলাদেশের সেরা দুই-তিনজন খেলোয়াড়ের একজন। আমার বিশ্বাস এটাতে কারো কোনো সন্দেহ নেই। এটা পেশাদার জায়গা। এখানে প্রশ্নই আসে না তাদের সাথে দ্বন্দ্বে যাওয়ার। তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। আমার জায়গা থেকে আমার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। আমারও পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল আমি কোথায় খেলবো। তামিমকে তারা অনেক আগেই দলে টেনেছিল। এটা খুব স্বাভাবিক।
 
ব্যক্তিগতভাবে কামাল ভাইকে (আহম মুস্তফা কামাল) আমি অনেক সম্মান করি। উনি বোর্ড সভাপতি ছিলেন। আমার অনেক বিপদেও উনি আমাকে সাহায্য করেছেন। আমি মনে করি উনাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা, দ্বন্দ্ব নেই। সেটা থাকার কোনো কারণও দেখি না। উনাদের সাথে আমার কোনো খারাপ সম্পর্ক নাই। কাজটা হচ্ছে উনি আমাকে রাখতে না চেয়ে তামিমকে রাখতে চেয়েছে। এটা উনার জায়গা থেকে উনি ঠিক আছে। আমি আরেক দলে খেলেছি। এর পরের বছর যদি রংপুর আমাকে না রাখে, আমি আরেক দলে খেলবো। এটা স্বাভাবিক বিষয়। এখানে তো দোষের কিছু খুঁজে পাই না।
 
বাংলাদেশের ক্রিকেটে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। কোচ হিসেবে তার মূল্যায়ন কিভাবে করবেন?
 
হাথুরুসিংহে আমাদের জন্য, যদি রেজাল্টের দিকে তাকান তাহলে বলবো যে অন্যতম সেরা কোচ ছিল। তার প্ল্যানিং, সবকিছু আপ টু দ্য মার্ক। সত্যি কথা বলতে, খুব কঠিন সময়ে ও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বিশেষ করে যখন আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় সংগ্রাম করেছি। যেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে, সেখানেই ও নাই। আমাদের জন্য তো অবশ্যই এখন অনেক চ্যালেঞ্জিং সময়। যেহেতু আমরা কোচ ছাড়া আছি। প্ল্যানিংয়ের একটা ব্যাপার আছে। হয়তোবা শুনছি সুজন ভাইকে (খালেদ মাহমুদ সুজন) দিতেও পারে। যেই হোক তাকে আবার প্ল্যান করতে হবে। তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এগুলো কঠিন কাজ। বাইরে থেকে যত সহজ মনে হয়, অত সহজ নয়। একটা কোচের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া। সময়ের ব্যাপারও। খেলোয়াড়রা তার সঙ্গে মানিয়ে নিবে, সেও মানিয়ে নিবে এটা একটা প্রক্রিয়া। আমি বলবো যে, তার (হাথুরুসিংহের) সময়টা আমরা খুবই ভালো কাটিয়েছি। আমি তার সময় প্রায় তিন বছর অধিনায়ক ছিলাম। আমার সময়টা খুবই ভালো কেটেছে। আমি মনে করি এখন সবমিলিয়ে কঠিন সময় যাবে। যেহেতু আবার নতুন কোচ আসবে।
 
জানুয়ারিতে হাথুরুসিংহেই শ্রীলঙ্কার কোচ হয়ে আসছে। ওই ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতি আমাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জের জায়গা তৈরি করবে কি?
 
চ্যালেঞ্জ আমি বলবো না। কারণ প্রত্যেকটা ম্যাচই তো আপনি বাংলাদেশের হয়ে আলাদা করে খেলবেন, তখন প্রত্যেকটা ম্যাচই চ্যালেঞ্জ। ওর জন্য আলাদা করে বলার কিছু নাই। আমরা অবশ্যই জিততেই চাই। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড যার সঙ্গেই হোক। এখানে আলাদা চ্যালেঞ্জ কিছু নাই। তবে হ্যাঁ একটা জিনিস হতে পারে, চ্যালেঞ্জটা খেলার মাঠে হতে পারে এ কারণে, যেহেতু ও আমাদের খুব সম্প্রতি আমাদের সমস্ত খেলোয়াড়ের ডকুমেন্টস বলেন, শক্তি বলেন, দুর্বলতা বলেন, সেটা যদি ছয়মাস পরে হতো তাহলে আলাদা জিনিস। একটা খেলোয়াড়ের দেখা গেল একটা জিনিস উন্নতি করে ফেলেছে। দেখা গেল, ও এটা জানে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সবই ও জানে। তাই ওর প্ল্যানিং করতে খুব সহজ হবে। ও নির্দিষ্ট জায়গায় আলাদা আলাদা খেলোয়াড় তৈরি করতে পারবে। এর শক্তি এখানে, তুমি এই সময়ে ব্যাটিং কর বা ওর শক্তি এখানে। এ জায়গায়টাতে একটা ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে।
 
ইত্তেফাক/রেজা