মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পর ফিরে না আসা ছেলের জন্য এখনও হা-পিত্যেশ করেন বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়া বৃদ্ধা জাবেদা খাতুন। দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে তিনি ছেলের আশায় দিনরাত অতিবাহিত করেন। ছেলের মৃত্যু নিয়ে সংশয় কাটে না তার। ১৯৯৬ সালে যখন তার স্বামী আবুল মণ্ডল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, সেসময় তিনিও এই বিশ্বাস নিয়েই মারা গেছেন যে মেজো ছেলে বেঁচে আছে।
সেই স্মৃতি উল্লেখ করে বৃদ্ধা জাবেদা খাতুন বলেন, ‘বাপ-মায়ের মন তো তাই মানব্যার (মানতে) চায় না’। মায়ের এই কথার মাঝেই অবশ্য বড় ছেলে যোদ্ধা আব্দুল কাদের বাবলু জানান, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে জয়পুরহাটের শান্তি বাহিনীর প্রধান আব্দুল আলিমের নির্দেশে তার ভাইসহ আরও দুই যুবককে গুলি করে হত্যা করে পাক সেনারা।
স্মৃতি ভারাক্রান্ত মা, কথার খেই হারিয়ে ফেলায় বাবলু বলেন, ১৯৬৭ সালে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হন। গ্রামের বিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগ থেকে পাশ করে শহরের কলেজে গিয়ে বিজ্ঞান বিভাগ নেওয়ায় তিনি ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি। একারণে ১৯৭০ সালে গাইবান্ধা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরীক্ষা শেষে মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোল বেজে ওঠে। তরুণ হিসেবে তিনিও যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। অন্যান্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে চলে যান ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য।
প্রশিক্ষণ শেষে যখন দেশে ফেরেন সেসময় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফকিরের সঙ্গে তিনি নিজ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আর এই কথাটি এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। একদিন স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তাকে আটক করার জন্য উপজেলার দেবীপুর গ্রামে তাদের বাড়ি ঘেরাও করে পাক সেনারা। তিনি সেসময় বাড়িতে ছিলেন না। কিন্তু বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে রাজাকার ও পাক সেনা সদস্যরা। সেদিন পাক বাহিনী ফিরে গেলে তার বাবা-মা আবারও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছাড়েন। সেসময় ছোট ভাই শামসুল আলম বাদল পড়তেন দশম শ্রেণিতে। বাবা-মাসহ অন্যান্য ভাই-বোনদের সঙ্গে দেবীপুরের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বাদলকেও যেতে হয় পার্শ্ববর্তী কালাই উপজেলার আওড়া গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে।
বাবলু জানান, সম্ভবত বাড়ি ছেড়ে যাওয়াতে ক্ষিপ্ত হন বাদল। নিজেদের বাড়ি ছেড়ে যাদের কারণে গ্রাম ছাড়তে হয়েছে তাদের প্রতি প্রতিশোধ নিতে বড়ভাইয়ের মতো তিনিও যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছার কথা তিনি মাকেও জানান। কিন্তু তাতে রাজি হননি মা। এরই মাঝে আওড়া গ্রামের মোজাম ও কামাল নামের দুই যুবকও যুদ্ধে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একদিন তারা জানতে পারে মুক্তিফৌজরা কালাই উপজেলার ইটাখোলা ব্রিজটি উড়িয়ে দিয়েছে। ওই তিন যুবক সেখানে অভিযান চালানো মুক্তিফৌজদের মাধ্যমে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু মা যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিবে না এজন্য তাকে বাড়ি থেকে সঙ্গে আনা কিছু জিনিস বিক্রি করার কথা বলে অপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্য বিক্রি করে টাকা যোগাড় করে। সেই টাকা নিয়ে মোজাম ও কামালের সঙ্গে বাড়ি ছাড়েন বাদল।
যুদ্ধের পর তিনি (বাবলু) খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যায় ইটখোলা। সেখানে যেসব মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালায়। স্থানীয় কিছু রাজাকার বিষয়টি টের পায়। তারা ওই তিনজনকে মুক্তিফৌজ হিসেবে আটক করে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পরে তাদের জয়পুরহাট নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শান্তি কমিটির প্রধান রাজাকার আব্দুল আলিমের নির্দেশে একটি ট্রাকের ওপর গুলি করে হত্যা করা হয় তিনজনকে। যুদ্ধের পর ভাইয়ের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি লোকমুখে এসব শুনে এসে বাবা-মাকে জানালেনও তারা বিশ্বাস করেননি উল্লেখ করে বাবলু বলেন, শেষে বাবা নিজেই ছেলেকে খোঁজার জন্য ভারত যান। সেখানে বেশ কিছুদিন খোঁজ করে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে দেশে ফেরেন। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি মনে করেছেন তার ওই ছেলে মরেনি, সে ফিরে আসবে। বাবার মৃত্যুর পর মা যেন আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়েন।
বাদলের কিছু স্মৃতি বিশেষ করে একটি খাতা যেটাতে তার নিজের নাম লিখে ফুল আঁকা রয়েছে, কিছু কাপড়চোপড় মাঝে মাঝেই বের করে কান্নাকাটি শুরু করতো। একারণে একদিন ৫ ভাইয়ের মধ্যে সব ছোটটি বাদলের সেই চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে কাপড়-চোপড় আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। তবে খাতাটি মা তার নিজের কাছে রেখে দেওয়ায় তা আর নষ্ট করতে পারেনি। ওই ঘটনার পর আর প্রকাশ্যে কান্নাকাটি না করলেও রাতের আঁধারে সেই খাতা বের করে নিজেই কাঁদেন।
জাবেদা খাতুন বলেন, ছোলডার কথা মনে হলেই আর থাকতে পারি না, তাই ওই খাতা নেড়েচেড়ে দেখি। এরপর খাতাটি বের করে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তিনি বলেন, ছোলডা যদি মরেই যায়, তো সরকার তাকে শহীদ হিসেবে ঘোষণা দিবি, তাও তো দেয় না। আমার তো জীবনের শেষ সময়, এখনও যদি সেরকম ঘোষণা হতো, এতে অন্ততঃ মনে হতো যে এই পরিবারটা শহীদের পরিবার। কিন্তু তাও হলো না। ছ্যোলডাকও ফিরে পেলাম না। ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘বুকের মধ্যে এই ব্যাথাটা নিয়েই হয়তো চলে যেতে হবে।’
শিবগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল বারী জানান, কিশোর অবস্থায় শামসুল আলম বাদল যুদ্ধে গিয়ে নিখোঁজ হন। আজও তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে তার বড়ভাই বাবলু খোঁজ নিয়ে জানতে পরেছে আব্দুল আলিমের নির্দেশে রাজাকাররা জয়পুরহাটে তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।
শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র তৌহিদুর রহমান মানিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকের মতো এই পরিবারটিও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তারপরও বাড়ির মেজো ছেলে শামসুল আলম বাদল যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।রাজাকাররা তাকে মেরে ফেলেছে। এজন্য সরকারিভাবে এই পরিবারটিকে শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
ইত্তেফাক/কেকে
