বিজয়ের ৪৬ বছর উদযাপনে গতকাল শনিবার রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গন ছিল আনন্দমুখর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সাভারের স্মৃতিসৌধ অভিমুখে ছিল মানুষের স্রোত। শিশু-কিশোররা ছুটেছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনেকে ভিড় করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। জাতীয় জাদুঘরের দ্বার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। নগরীর মঞ্চে মঞ্চে ছিল একাত্তরে প্রেরণা সঞ্চারী সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান, নাচসহ নানা আয়োজন।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট :সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ২৭তম বিজয় শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৭ই মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক বাংলার ঘরে ঘরে/৭ই মার্চ সম্পদ আজ বিশ্ব-মানবের তরে’। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ও রামেন্দু মজুমদার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, মানজার চৌধুরী সুইট প্রমুখ।
শোভাযাত্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে গেয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেন জোটভুক্ত শতাধিক সংগঠনের কয়েক হাজার সংস্কৃতি-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসে শেষ হয়। বিকেল থেকে শহীদ মিনারসহ রাজধানীর ৭টি মঞ্চে একযোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শিল্পকলা একাডেমি:একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক কামাল লোহানী। সাংস্কৃতিক পর্বে বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা দেশের গান, নাচ ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।
বাংলা একাডেমি : একাডেমির নজরুল মঞ্চে ছিল প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, বিজয় ও বিজয়ের মহানায়ক’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ। আলোচক ছিলেন রামেন্দু মজুমদার, খুশী কবির ও নাদীম কাদির। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আজকের এই দিনে আমরা যে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম সেটি কেবল মাটি ও পতাকার বিজয় নয়, আদর্শিক বিজয়ও। আমরা মৌলবাদ, জঙ্গিবাদসহ আজ যে সব বিকারের কথা বলছি তা মোচন করা সম্ভব হবে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যকে সামনে তুলে ধরে অগ্রসর হতে পারলে। তবেই শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।’ সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন তিমির নন্দী, আবদুল হালিম খান প্রমুখ।
ছায়ানটের আয়োজনে দেশের গান: ছায়ানটের আয়োজনে বসেছিল দেশের গানের আসর। এর যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সবাই জাতীয় পতাকার লাল সবুজের পোশাকে রাঙিয়ে তুলেছিল। সবাই এক সঙ্গে গেয়ে উঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ শিল্পীরা আসেন লাল শাড়ি আর পাঞ্জাবি গায়ে। দর্শকরা এসেছিলেন সবুজ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পড়ে।
বেলা পৌনে চারটায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, ছায়ানটের সভাপতি সন্?জীদা খাতুন ও দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান।
শিশু একাডেমি :‘আমার ভাবনায় ৭ই মার্চ’ শীর্ষক শিশুদের আঁঁকা চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে শেখ রাসেল আর্ট গ্যালারি উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশু প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু সচিব নাছিমা বেগম। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী শিল্পীরা।
কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা : সেগুনবাগিচার কচি-কাঁচা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করে কচি-কাঁচার মেলা। অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শোনান স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। সভাপতিত্ব করেন মেলার খুদে সদস্য আদিবা কিবরিয়া।
চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে বিজয়ের মেলা: ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে গতকাল শনিবার ছিল বর্ণিল বিজয় মেলা। সম্মিলিতভাবে মেলার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, সুজেয় শ্যাম, ফকির আলমগীর, তপন মাহমুদ, খুরশীদ আলম, শাহিন সামাদসহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা। যোগ দেন মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। এ সময় ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। মেলায় শহীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন স্টলে প্রদর্শন করা হয় মুক্তিযুদ্ধের নানা দলিল, গ্রন্থমালা, আলোকচিত্র ও ডায়েরি।
ইত্তেফাক/আনিসুর
