মিয়ানমারে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আগে ফিরে যেতে চায় না বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে প্রকাশ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি জোরপূর্বক নয় বরং স্বেচ্ছায় হতে হবে। মানবাধিকারের শর্ত পূরণ হওয়ার আগে জোরপূর্বক ফেরত পাঠালে রোহিঙ্গাদের জীবন আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মানবিক সংকট মোকাবেলায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থানরত ২০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে অক্সফাম। সংস্থাটির রিজিওনাল ক্যাম্পেইন এন্ড পলিসি ম্যানেজার সুলতানা বেগম বলেন, অক্সফাম রোহিঙ্গাদের সঙ্গে গ্রুপ আলোচনাসহ বিশদভাবে সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
রোহিঙ্গারা বলছে, তাদের কাজ করা ও অবাধে ভ্রমণ করার নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার ফিরে যাবে না। রোহিঙ্গারা যেখানে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে, সেখানেও তারা যৌন হয়রানিসহ অপহরণের শিকার হচ্ছে। এরপরও তারা উপযুক্ত পরিবেশের আগে রাখাইনে যেতে চায় না। আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারীরা সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কারণ রাখাইনে ধর্ষণ ও প্রিয়জনের মৃত্যুর মতো দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। মানবাধিকারের শর্ত পূরণ হওয়ার আগে জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন করানো হলে রোহিঙ্গারা আত্মহত্যা করবে বলে জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি সমঝোতা স্মারক সই করে আগামী জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু অক্সফামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের নিরাপদ পরিবেশ এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের বেশি মানবিক সাহায্য প্রয়োজন তাদের চিহ্নিত করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের উচিত রোহিঙ্গাদের মতামতে দৃষ্টি দেওয়া। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের কাছে এটি প্রধান বার্তা। এছাড়া এই অঞ্চল ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও সংস্থার কাছেও একই বার্তা দিতে চায় অক্সফাম।
প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে অক্সফাম। এর মধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। আনান কমিশনের সুপারিশে মিয়ানমারের সব নাগরিকের সম-অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তারা যেন স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এছাড়া যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা জমি হারিয়েছে, তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া অক্সফাম বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর’কে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন হংকং অক্সফামের ডিরেক্টর জেনারেল ড. ত্রিনি লিউং, এশিয়া রিজিওনাল ডিরেক্টর লিলিয়ান মার্কডো ও অক্সফামের ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি মৃদুলা বাজাজ, অক্সফাম বাংলাদেশের পিডি এম বি আখতার প্রমুখ।
ইত্তেফাক/এমআই
