গত ১০ অক্টোবর ধানমন্ডি স্টার কাবাবের সামনে অবস্থানকালীন আমার ফোনে একটি কল আসে। আমি টাকা-পয়সার কথা বলছিলাম। আমার মনে হয়, ওখানেই কেউ আমাকে টার্গেট করেছে। তারা (অপহরণকারীরা) হয়তো মনে করেছে, আমার অনেক টাকা। এই ভেবে তারা আমাকে পেছন থেকে হাত ও চোখ বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গলের মধ্যে একটি টিনশেড বাড়িতে নিয়ে রাখে। সেখানেও প্রায় প্রতিদিন তারা আমার কাছ থেকে টাকা দাবি করে আসছিল।
দীর্ঘ দুই মাস ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ফিরে এসে মোবাইল ফোনে ও গতকাল বুধবার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার থানাহাটিতে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পূর্বপশ্চিমবিডি ডট নিউজের সাংবাদিক উত্পল দাস। উত্পল ফিরে আসায় তার বাবা-মা ও স্বজনরা আনন্দিত। তবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন তার পরিবার। সাংবাদিক উত্পল দাস বলেন, ধানমন্ডি স্টার কাবাবের সামনে থেকে ধরে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তবে কারা তাকে ধরে নিয়েছিল, কোন এলাকায় আটকে রাখা হয়েছিল- সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। অপহরণকারীরা পেছন থেকে চোখ বেঁধে ফেলায় কারো চেহারা দেখতে পাইনি। আমাকে নিয়ে টিনশেডের নরমাল একটা ঘরে আটকে রেখেছিল। সেখানে তিন বেলা দরজার নিচ থেকে নরমাল খাবার দেওয়া হতো। ঘরে চৌকি বা খাট ছিল না, স্যাঁতস্যাঁতে ফ্লোরে থাকতে হতো। ওই ঘরের সঙ্গে একটা বাথরুম ছিল। সেখানে গোসল করতাম। ঘরের দরজা বাইরে থেকে সবসময় তালাবদ্ধ থাকতো, মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতাম। তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথম দিকে আমাকে চড় থাপ্পড় মারা হয়েছে। মোবাইল ফোনও তারা নিয়ে নিয়েছিল। তারা আমাকে বলত, তোর অনেক টাকা, তুই টাকা দে। কয়েকদিন আগে ঘরের বাইরে অপহরণকারীদের ফিসফিস করে বলতে শোনেন, পুলিশ মনে হয় জেনে গেছে, আমরা কোথায় আছি। পুলিশ-র্যাব জেনে যাওয়ার কারণেই হয়তো তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন উত্পল।
এরপর মঙ্গলবার রাতে চোখ বাঁধা অবস্থায় তিন-চার ঘণ্টা একটি গাড়িতে করে তাকে ঘোরানো হয়। তারপর নামিয়ে দেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের ওই ফিলিং স্টেশনে।
উত্পল বলেন, আমাকে নামিয়ে দেওয়ার সময় চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে তারা বলেছে, আমরা যখন গাড়ি টান দেব- তখন তুই চোখ খুলবি। আর পিছন ফিরে তাকাবি না। ছেড়ে দেওয়ার সময় উত্পলকে তার মোবাইল ফোনটিও ফেরত দেয় অপহরণকারীরা। সেই ফোন দিয়ে উত্পল যখন স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন, তখন তাকে দেখতে পান শাহ্জালাল সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী ঝন্টু চন্দ্র বণিক।
ঝন্টু চন্দ্র বণিক বলেন, আমি গাড়িতে গ্যাস দেওয়ার সময় দেখি রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় যাবেন? তখন উনি ফোনে কথা বলতেছিলেন। ঘণ্টাখানেক পর পুলিশ এসে উনার সঙ্গে কথা বললো।
রূপগঞ্জ থানার ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শহীদুল ইসলাম ওই ফিলিং স্টেশনে গিয়েছিলেন পুলিশ সুপারের ফোন পেয়ে।
ফাঁড়ির ইনচার্জ শহীদুল ইসলাম বলেন, এসপি সাহেব ফোন করে বললেন, উত্পল দাস নামের নিখোঁজ একজন সাংবাদিককে পাওয়া গেছে, আমি কোনো তথ্য জানি কি না। আমি বললাম, খোঁজ খবর নিচ্ছি। ওই ফিলিং স্টেশনে গিয়ে পরিদর্শক শহীদুল উত্পলকে স্টেশনের ভেতরে নিয়ে যান এবং তার সঙ্গে কথা বলেন। সেখান থেকে ফোনে পুলিশ সুপারের সঙ্গেও তার কথা হয়। শহীদুল বলেন, তাকে কে নিয়ে গেছে এমন কিছু সে বলতে পারেনি। কারা নামিয়ে দিয়ে গেছে তাও তিনি বলতে পারেননি। মনে হয় মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে গেছে এবং ফেলে গেছে। পরে তাকে ভুলতা ফাঁড়িতে নেয়া হয়। খবর পেয়ে রাত আড়াইটার দিকে সেখানে এসে উত্পলকে নিয়ে নরসিংদীর রায়পুরার পথে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা।
উত্পলের ফিরে আসার খবরে রাত আড়াইটার দিকে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আছেন তার মা, বাবা, বোনসহ কয়েকজন আত্মীয়। সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উত্পল তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, আমি ঠিক আছি। আমার কিছু হয়নি। উত্পলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস বলেন, ছেলেকে আমি ফিরে পেয়েছি এটাই আমার বড় আনন্দ। আপনাদের সহযোগিতা বেশি কামনা করি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
ইত্তেফাক/নূহু
