রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। একেক নেতা বলছেন একেক কথা। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বললেও সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ করেছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দলের দুই শীর্ষনেতার এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে তোলপাড় চলছে দলে। বিব্রত বোধ করছেন নেতাকর্মীরা। এদিকে দলীয় মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা বৃহস্পতিবার রাতেই ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচনের দিন বিকালে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আজ্ঞাবহ ইলেকশন কমিশন নিজেদের ব্যর্থতার কারণে রংপুরে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারেনি। নির্বাচন শুরুর পর থেকে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য ও কেন্দ্র দখলে সেটিরই বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে।’
তবে গতকাল শুক্রবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের কালিবাড়িতে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, ‘সব মিলিয়ে রংপুর সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন কমিশনের ওপর এখনো আস্থা আনার মত তেমন কিছু হয়েছে বলে বিএনপি মনে করে না। তাদের প্রার্থীকে প্রচার চালাতে দেওয়া হয়নি, পুলিশ বাধা দিয়েছে- এসব ঠিক। তারপরও সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ যে ভোট হয়েছে, তার ফল মেনে নেওয়া উচিত।’
নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, এরশাদ সাহেব নিয়ম ভেঙে আগের দিন আমার সঙ্গেই রংপুরে গেছেন। উনি সারারাত ছিলেন, ভোট দিয়ে এসেছেন। তার উপস্থিতিটাই সেখানে কাজ করেছে বলে আমার মনে হয়। তবে আমি মনে করি, সবমিলিয়ে নির্বাচনটা সকলেরই গ্রহণ করা উচিত।
এদিকে গতকাল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে রুহুল কবির রিজভী রংপুর নির্বাচন প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনে কি হয়েছে আমরা জানি। গণমাধ্যমে সবকিছু এসেছে। এরপরও মিথ্যা প্রচার করে সব ঢেকে রাখবেন। আপনি সূক্ষ্ম কারচুপি করাবেন, প্রকাশ্যে আপনি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করবেন, আপনি ইলেকশনগুলো দখল করে নেবেন, তা বন্ধ করতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার রসিক নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ১ লাখ ৬০ হাজার ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু পান ৬২ হাজার ৪০০ ভোট। আর বিএনপির প্রার্থী কাওসার জাহান বাবলা ৩৫ হাজার ১৩৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। ভোট গ্রহণ শেষে গণনা শুরুর পর নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনে বিএনপি। বিএনপির এমন অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেন, রংপুর সিটি নির্বাচনের পরিবেশ প্রথম থেকেই ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ বলে খ্যাত রংপুরে ভোটের ফলাফলে বিএনপি বরাবরই পিছিয়ে। রংপুরের কোনো আসনেই বিএনপির প্রার্থী জিততে পারেননি। রসিক নির্বাচনে এবারের বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা গতবারও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন। সেই নির্বাচনে তার অবস্থান ছিল চতুর্থ। তিনি তখন পেয়েছিলেন ২১ হাজার ২৩৫ ভোট। এবারের নির্বাচনে ভোটের পরিমাণ তার বেড়েছে ১৪ হাজার। এ ব্যাপারে বিএনপির রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জিতে গেলেও আমাদের দলের ভোট কিন্তু দিন দিন বাড়ছে। তার একটি কারণ সাংগঠনিক শক্তি।
এদিকে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ফলাফল বিপক্ষে যেতে থাকলে সংবাদ সম্মেলন করে ফল বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা। এ বিষয়টি দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী জানতেন না। স্থানীয় একাধিক নেতা জানান, গত সিটি নির্বাচনেও বাবলা ৪র্থ হয়েছিলেন। তখন কিন্তু তিনি নির্বাচন বর্জন কিংবা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেননি।
বিএনপি প্রার্থীর এতো কম ভোট পাওয়ার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে বিএনপি জোটের জামায়াতে ইসলামী, খেলাফতে মজলিশ, ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতে ইসলামের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিতর্কিত পীর দেওয়ানবাগীর রংপুরের খলিফা কাওছার জামান বাবলা। এ কারণে ২০ দলীয় জোটের শরীক ইসলামী দলগুলো তার পক্ষে কাজ করা থেকে বিরত ছিল।
জানা গেছে, মূলত ইসলামপন্থী কোনো দল ও তাদের সমর্থকরা বাবলাকে ভোট দেননি, এমনকি ভেতরে ভেতরে তার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। নির্বাচনের দিন তাদের কেউ কেন্দ্রে যাননি। অথবা গেলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। আর এভাবেই ভরাডুবি হয়েছে বিএনপির।
ইত্তেফাক/এমআর
