মহৎমানস

কুমুদিনীর জ্যোতি

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:৩৩
 
নারীশিক্ষা, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান, সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করাসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রণদা প্রসাদ সাহা। অসহায় অসংখ্য পরিবারকে তিনি অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। সমাজ থেকে ধর্মীয় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারগুলো দূর করার জন্য তিনি গড়ে তোলেন সামাজিক আন্দোলন। দরিদ্র মানুষকে দান করার জন্য তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন দানবীর নামে। বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সাহায্য করতে থাকেন
 
কুমুদিনীর সঙ্গে একজন মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। তিনি হলেন দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। তাঁর হাত ধরেই এই বৃহত্ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। প্রথম জীবনে রণদা প্রসাদ সাহাকে খুব সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি খুব কম বয়সে বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও সরাসরি পান তিনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম সামরিক সংগঠন বা ইউনিট বেঙ্গল-এর অ্যাম্বুলেন্স কোর-এর সদস্য হিসেবে কাজ করেন। তিনি ছিলেন ৬ ডিভিশনের ২ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে। এ ডিভিশন বাগদাদ অঞ্চলে যুদ্ধে ১৯১৬ সালের ২৯ এপ্রিল তুর্কি বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করলে রণদা প্রসাদসহ অন্যান্যদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯১৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের সুবাদে রণদা প্রসাদ সাহা কলকাতায় ফেরত আসতে সক্ষম হন।
 
সে-সময় নদীপথে লঞ্চসমূহের ইঞ্জিন কয়লাদ্বারা চালিত হতো। রণদা প্রসাদের ছিল কয়লার ব্যবসা। পরবর্তী সময়ে তিনি বেশকিছু লঞ্চ ক্রয় করেন। এসব লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়লা পরিবহনে ব্যবহূত হতো। ১৯৩৯ সালে জমিদার নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী, ডা. বিধানচন্দ্র রায়, জাস্টিস জে. এন. মজুমদার ও নলিনী রঞ্জন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে রণদা প্রসাদ ‘বেঙ্গল রিভার সার্ভিস’ নামে একটি নৌ-পরিবহন কোম্পানি চালু করেন। নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী ছিলেন কোম্পানির প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর মৃত্যুতে রণদা ওই পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ব্যবসায় একের পর এক সাফল্য লাভ করতে শুরু করেন।
 
ব্যবসার নানা ক্ষেত্রে তিনি সাফল্য অর্জন করতে থাকেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে অর্থাত্ ১৯৪২ সালের দিকে সরকার খাদ্য সংগ্রহ ও মজুদের জন্য অবিভক্ত বাংলা থেকে ৪ জন প্রতিনিধি নিয়োগ করে। তাদের মধ্যে প্রধানতম ছিলেন রণদা প্রসাদ। সরকারের কাছে খাদ্য সংগ্রহের কাজ করে যথেষ্ট মুনাফা অর্জন করেন তিনি। এভাবে ১৯৪৭ সালের আগেই রণদা এদেশের প্রধান ব্যবসায়ী এবং শিল্প-উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
 
ব্যবসার মাধ্যমে তিনি যে পরিমাণ আয়-উপার্জন করেন, তাতে ভোগবিলাসে জীবন কাটানোই সঙ্গত ছিল। কিন্তু তিনি ব্যতিক্রম এক কাজে মনোযোগ দিলেন, সেটা হলো জনসেবার কাজ। তিনি ভাবলেন, এমন কিছু করতে হবে, যা মানবের কল্যাণে আসে। এই উদ্দেশ্যে মির্জাপুরে তিনি মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেন ১৯৩৮ সালে। ১৯৪৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হলে ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই ২০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন তত্কালীন গভর্নর লর্ড আর জি কেসি। এরপর ১৯৫৩ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিত্সা চালু হয়। যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এখানেই চালু হয়। ১৯৭০ সালে কুমুদিনী হাসপাতালে ৫০ শয্যার যক্ষ্মা ওয়ার্ড চালু করা হয়। হাসপাতালের শুরুর দিনগুলোতে রোগীদের সেবায় নার্সের ঘাটতি পূরণে স্থানীয় মহিলাদের সহায়তা নেওয়া হতো। হাসপাতালের অভ্যন্তরে নার্স প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন রণদা প্রসাদ সাহা। বর্তমানে এই হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৮৫০। কুমুদিনী হাসপাতালে উন্নত চিকিত্সা প্রদানের জন্য দেশ ও বিদেশের খ্যাতনামা চিকিত্সকরা এখানে আসেন। এছাড়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় রণদা প্রসাদ একটি মহিলা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয় ২০০১ সালে।
 
রণদা প্রসাদ সাহার দান করার ধরনটাও ছিল অন্য সব দাতার থেকে একেবারেই পৃথক। এই প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যদি দেখি, তবে আমরা দেখতে পাই—যখন তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেনেন তখন ছিল প্রায় চার-পাঁচশ পৃষ্ঠার প্রোপার্টির দলিল। এগুলো সমস্ত কিছু ছিল আর পি সাহার নামে। কিন্তু তিনি যখন ১৯৪৬ সালে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন তখন আর পি সাহার নামে যত সম্পত্তি ছিল তা মাত্র একটি কাগজের মাধ্যমে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে দান করে দেন। একটা মানুষের ভেতরে কতখানি দেশপ্রেম, মহানুভবতা থাকলে এক কলমের খোঁচায় সব দান করে দিতে পারেন সেটা এক বড় বিস্ময়। আগে কুমুদিনী হাসপাতাল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু হয় ১৯৩৮ সালে এবং যেগুলো পরিচালিত হতো আর পি সাহার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে।
 
তিনি যে নীতি ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে এই কাজ করার চিন্তা করেছিলেন সেটার প্রতিফলন জীবনের প্রথম পর্যায় থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের ভেতর পাওয়া যায়। আদর্শ এবং নীতিকে ঠিক রেখে বিভিন্ন সময়ে কুমুদিনীর সাথে বিভিন্ন বিষয়কে তিনি সংযুক্ত করেন। এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কল্যাণে তিনি যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সেগুলোই হলো এই প্রতিষ্ঠানের স্পিরিট। আমরা চেষ্টা করি সবসময় তাঁর সেই স্পিরিটটাকে ধারণ করে মানবকল্যাণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি সমাজের কল্যাণে আসে—এমনসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে। তাঁর মূল লক্ষ্যই ছিল সামাজিক সব কর্মকাণ্ডে কুমুদিনীর সমস্ত আয় খরচ করা। কুমুদিনীর বাইরেও এই কর্মকাণ্ডের বিস্তার ছিল। যেমন—বিভিন্ন রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি, যেকোনো ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে অনুসারীরা ধর্মীয় জ্ঞান যাতে পায় সেই ব্যবস্থা করা, সাইক্লোন সেন্টার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো দেখলে বোঝা যায়—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানই শুধু নয়; সমাজের যেখানে যেখানে সাধারণ মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তিনি সেই জায়গাতে দৃষ্টি দিয়েছেন।
 
প্রথমদিকে কুমুদিনীর প্রতিষ্ঠান তৈরির গল্প আরেক বিস্ময়। ১৯৩০-৩৫ সালের মধ্যে কুমুদিনী কলেজের কাজ শুরু হয়, সে-সময়ে যোগাযোগব্যবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কুমুদিনী হাসপাতালও সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজকের হাসপাতাল যেখানে রয়েছে, শুরুর সময়ে সেখানে ছিল অজপাড়াগাঁয়ের পুকুর ডোবা খাল, সেখানে দিনের বেলায়ও কেউ যাওয়া-আসা করত না। কিন্তু রণদা প্রসাদ মনের জোরে সেখানেই ওই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। প্রতিষ্ঠার সময় তিনি এটা নিয়ে ভাবেননি যে—আমি ঔষধ কীভাবে নেব, ডাক্তার কীভাবে নেব, অক্সিজেন কীভাবে নেব, বিদ্যুত্ কীভাবে আমি এইখানে ব্যবস্থা করব। এসব চিন্তা তাঁর উদ্যোগকে রহিত করতে পারেনি। রাস্তা-ঘাটহীন এক পরিবেশে তিনি বর্তমানে যা প্রায় এক হাজার শয্যার—এমন একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তখন কুমুদিনীর হেডকোয়ার্টার ছিল কলকাতায়। সে-সময়ে তিনি ইংল্যান্ড থেকে নার্স, ডাক্তার, ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকেও বড় বড় ডাক্তার  হাসপাতালে নিয়ে আসেন। লন্ডন থেকে নার্সিং টিউটর, নার্সিং ট্রেইনার নিয়ে আসেন। এঁদের মাধ্যমে তিনি গ্রামের বাল্যবিধবাদের ট্রেনিং করিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এঁরা কুমুদিনী হাসপাতালে কাজ করে গেছেন। কেউ কেউ আবার তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় কুমুদিনীতেই দিয়ে গেছেন।
 
নারীশিক্ষা, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান, সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করাসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রণদা প্রসাদ সাহা। অসহায় অসংখ্য পরিবারকে তিনি অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। সমাজ থেকে ধর্মীয় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারগুলো দূর করার জন্য তিনি গড়ে তোলেন সামাজিক আন্দোলন। দরিদ্র মানুষকে দান করার জন্য তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন দানবীর নামে। বিভিন্ন স্থানে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সাহায্য করতে থাকেন। উল্লেখ্য, ১৯৪৩ সালের দিকে দেশে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। হাজার হাজার মানুষ মরতে থাকে অনাহারে। তখন তিনি নিজের অর্জিত অর্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলেন প্রায় ৩০০ লঙ্গরখানা। টানা আট মাস এই লঙ্গরখানার মাধ্যমে তিনি দেশের অসহায়, অনাহারী মানুষকে খাবার জুগিয়েছেন।
 
কুমুদিনী হাসপাতালের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান। কুমুদিনী হাসপাতালটি বর্তমানে রূপ নিয়েছে বিশাল এক প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে একইসঙ্গে এটি হাসপাতাল ও মহিলা মেডিকেল কলেজ। এখানে দুস্থ মানুষের চিকিত্সা হয়।
 
কুমুদিনী মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের পাশাপাশি চলছে ভারতেশ্বরী হোমস। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে কুমুদিনী গার্মেন্টস, কুমুদিনী ট্রেড ট্রেনিং স্কুল, কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফট, কুমুদিনী ফার্মাসিউটিক্যালস, নার্সিং কলেজ, নার্সিং স্কুল। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে অসংখ্য মানুষ। শুধুমাত্র টাঙ্গাইল নয়, একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের জীবিকারও উত্স হয়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর