মহৎমানস

স্মাইল ট্রেন হাসি ফোটানোর ব্রত

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৪:৩০
 
‘স্মাইল ট্রেন’ এমনই একটি সংগঠন—১৯৯৯ সালে  চার্লস ওয়াং-এর নেতৃত্বে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু রোগীদের জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতব্য সংগঠন। সারা বিশ্বে প্রতি ৫ মিনিটে ১ জন শিশু স্মাইল ট্রেন কর্তৃক চিকিত্সা পাচ্ছে। এ পর্যন্ত ১২,০০,০০০-এরও বেশি শিশু চিকিত্সা পেয়েছে। ৮৭টি দেশে স্মাইল ট্রেন সেবা দিয়ে যাচ্ছে
 
কাটা ঠোঁট না ঠোঁট কাটা? না এ কোনো বিতর্ক নয়। যে সত্য কথা বলতে দ্বিধা-বোধ করে না, তা যতই অপ্রিয় হোক  —তাকে আমরা ঠোঁট কাটা বলি।
 
আর কাটা ঠোঁট? যাদের ঠোঁট সত্যিকারভাবেই কাটা থাকে জন্ম থেকেই, তাদেরকেও ঠোঁট কাটা বা কাটা ঠোঁট বলা হয়। আর তাতেই যত বিড়ম্বনা। কাটা ঠোঁট ও তালু ফাটা রোগীরা সময়মতো চিকিত্সা না পেলে খেতে অসুবিধা, ঘনঘন শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ, কান পাকা, নিউমোনিয়া, অপুষ্টিসহ বিভিন্ন প্রকার শারীরিক অসুস্থতায় ভোগে, এমনকি অনেকে অকালে মারাও যায়। যারা বেঁচে থাকে তারা বড় হলে বিভিন্ন প্রকার শারীরিক ও সামাজিক সমস্যায় ভোগে। সমাজে আর দশটি শিশুর মতো না হওয়ায় এদের থাকে মানসিক পীড়া। তালু ফাটা রোগীদের কথা অন্যরা বুঝতে পারে না, ঠোঁট কাটাদের মানুষ তার নাম ধরে না ডেকে ঠোঁট কাটা বলে ডাকে। তারা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না, কাজ পায় না, উপযুক্ত স্থানে বিয়ে হয় না। শুধু রোগী নিজে নয়, রোগীর পরিবারও ভোগে নানা অশান্তিতে। শিশুর ঠোঁট কাটার কারণে মায়ের তালাক হচ্ছে প্রায়ই। এ ধরনের শিশুর পরিবারে অনেকে আত্মীয়তা করতে চায় না। অনেক মা-বাবা আবার এ ধরনের শিশুকে নিয়ে সমাজের আড়ালে চলে যায়, এমনকি শিশুর দাদা-দাদি থেকেও। শিশুকে সুস্থ করে আবার সমাজে ফিরে আসে। কাটা ঠোঁট ও তালু ফাটা শুধু শারীরিক ও সামাজিক সমস্যা নয়, এর কারণে শিশু ও শিশুর পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায়ও ভোগে।
 
পৃথিবীতে গড়ে প্রতি ৫০০-৭৫০ জনের মধ্যে ১ জন শিশু কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু নিয়ে জন্ম নেয়। সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১,৭০,০০০-এরও বেশি ঠোঁট কাটা ও তালু ফাটা শিশু জন্ম নেয়। এ ধরনের শিশুদের ওপরের ঠোঁটের বিভিন্ন অংশে জন্ম থেকেই অল্প বিস্তর কাটা থাকতে পারে, সাথে দাঁতের মাড়ি, মুখগহ্বরের তালু বা টাক্রা, আলা জিহ্বাও কাটা থাকতে পারে, আবার শুধু আলা জিহ্বাসহ মুখগহ্বরের তালু বা টাক্রা ফাটা থাকতে পারে।
 
গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের মধ্যে শিশুর মুখমণ্ডল ও মুখগহবরের অংশসমূহ মিলিত না হলে ঠোঁট কাটা এবং তালু ফাটা হয়।
 
কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু শিশুর যত্ন
 
মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো মা এবং শিশু দুজনের জন্যই সবচেয়ে উপকারী। মায়ের দুধের বিকল্প নেই। কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালুযুক্ত অনেক শিশু ঠিকমতো মায়ের দুধ টানতে পারে না। তাদেরকে মায়ের দুধ কোনো পরিষ্কার পাত্রে নিয়ে চামচ বা ড্রপার অথবা বড় ছিদ্র যুক্ত ফিডার দিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। কোনোভাবেই শোয়া অবস্থায় খাওয়ানো যাবে না, অর্ধ শোয়া-অর্ধ বসা ভঙ্গিতে অথবা বসানো অবস্থায় খাওয়াতে হবে। খাওয়ানোর পর শিশুকে কাঁধে নিয়ে ঢেকুর তুলতে সাহায্য করতে হবে। মায়ের দুধের পরিমাণ কম হলে গরুর দুধ কিংবা টিনের দুধ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাওয়াতে হবে। এদের খাওয়াতে অনেক সময় লাগতে পারে, তাই এদেরকে ধৈর্য নিয়ে খাওয়াতে হবে। তাদের পুষ্টি ঠিক রাখতে হবে।
 
কথায় বলে, দুর্ভাগ্য একা আসে না। এদের ক্ষেত্রেও তাই। অনেকেই জন্মগত হূদরোগসহ নানা জটিল রোগ নিয়ে জন্ম নিতে পারে। তাই জন্মের পরপরই চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া জন্মের পরপরই সকল শিশুর মাথা, চোখ, নাক, কান, মুখ গহ্বর, মলদ্বার, যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করে দেখা উচিত। তালু ফাটা বাইরে থেকে দেখা যায় না।
 
কথা বলা 
 
জিহ্বা, তালু ও ঠোঁটের মিলিত প্রয়াসে মুখের শব্দ তৈরি হয়। তাই ঠোঁট ও তালু ঠিকমতো গঠিত না হলে কথা বলতে ও উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।
 
নরম তালু কথা বলার সময় ওপরের দিকে উঠে নাক দিয়ে বাতাস বের হওয়া বন্ধ করে। যাদের নরম তালু ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তাদের কথা বলার সময় নাক দিয়ে বাতাস বের হয়ে যায়, ফলে তারা নেকো স্বরে কথা বলে।
 
অপারেশনের সাথে সাথেই কথা বলার ধরন বদলায় না। এতে সময় লাগে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কথা বলার প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
 
যদি সঠিক বয়সে চিকিত্সা না করা হয় তবে কথা বলার অসুবিধার কারণে শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। 
 
শ্রবণশক্তি 
 
তরল পদার্থসমৃদ্ধ একটি নলের সাহায্যে গলার মধ্যে কানের সংযোগ আছে। তাই তালু কাটা রোগীর শ্রবণ সমস্যা হতে পারে। তালু কাটা রোগীর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা প্রয়োজন—যাতে চিরতরে শ্রবণশক্তি নষ্ট না হয়।
 
দাঁত
 
সাধারণত ঠোঁট কাটা ও তালু কাটা শিশুর দাঁতের মাড়িতেও ফাঁক থাকে। অনেক সময়ই ফাঁকা মাড়িতে দাঁত ওঠে না। এতে দাঁত-মুখ পরিষ্কার করা কষ্টসাধ্য, ফলে দাঁতের ক্ষয়রোগ ও মাড়ির ক্ষয়রোগ হয়। তাই দাঁত-মুখের রোগ কমানোর জন্য প্রতিবার খাওয়ার পর দাঁত মাজা বাঞ্ছনীয়।
 
চিকিত্সা
 
চিকিত্সা একটাই—অপারেশন, যদি শিশু শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। ঠোঁট কাটা ও তালু ফাটা রোগীর চিকিত্সায় ভালো ফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সা, একাধিক অপারেশন এবং পরবর্তী সময়ে কথা বলার প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। ঠোঁট ৩ মাস বয়সে, তালু ৯-১৮ মাস বয়সের মধ্যে (দেরিতে করলে কথা পুরোপুরি ঠিক হবে না), বিকৃত নাক ৩-৪ বছর বয়সে, দাঁতের মাড়ি ৬-৭ বছর বয়সে অপারেশন করানো উচিত। 
 
কথা বলার প্রশিক্ষণ
 
অপারেশনের পর শিশুর কথা বলার ধরন পরীক্ষা করতে হবে। যত অল্পবয়সে সম্ভব কথা বলার সঠিক প্রশিক্ষণ দিলে শিশুরা বেড়ে ওঠার সাথে সাথে সুন্দরভাবে কথা বলতে পারবে। শিশুরা শব্দ তৈরি করা বা কথা বলা শুরু করলেই তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কথা বলা কিংবা ভাষাশিক্ষার প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষকের নির্দেশমতো বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য বাড়িতে নিয়মিত শিশুকে প্রশিক্ষণ দিবেন। শিশুকে কথা বলার জন্য জোর করা যাবে না। শিশুদের কথা বলার জন্য পারিবারিক সহযোগিতার প্রয়োজন। শিশু সঠিক বা সঠিকের কাছাকাছি শব্দ উচ্চারণ করতে পারলে তাকে উত্সাহ দিতে হবে।
 
ঠোঁট কাটা ও তালু ফাটা শিশুদের পরিবার ও সমাজে সাদরে গ্রহণ করে তাদেরকে সকলপ্রকার সাহায্য করা উচিত। সময়মতো অপারেশন করলে এবং ক্ষেত্রবিশেষ কথা বলার প্রশিক্ষণ দিলে এরা আর দশ জনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। তারা দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারবে। ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ ইং তারিখে প্রকাশিত ‘BMJ Glob Health’ সাময়িকী থেকে জানা যায়, একটি কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু রোগীকে সময়মতো অপারেশন করে সুস্থ করতে পারলে সে সারা জীবনে ১৬,১৩৩.০০—৪২,৩৫১.০০ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত আয় করতে পারে।
 
স্মাইল ট্রেন
 
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার সেবায় বিশ্বে অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন ঠোঁট কাটা ও তালু ফাটা শিশুদের সেবায় এগিয়ে আসছে। ‘ স্মাইল ট্রেন’ এমনই একটি সংগঠন। ১৯৯৯ সালে  চার্লস ওয়াং-এর নেতৃত্বে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু রোগীদের জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতব্য সংগঠন। সারা বিশ্বে প্রতি ৫ মিনিটে ১ জন শিশু স্মাইল ট্রেন কর্তৃক চিকিত্সা পাচ্ছে। এ পর্যন্ত ১২,০০,০০০-এরও বেশি শিশু চিকিত্সা পেয়েছে। ৮৭টি দেশে স্মাইল ট্রেন সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
 
স্মাইল ট্রেন-এর মাধ্যমে শুধুমাত্র জন্মগত ঠোঁট কাটা ও তালু ফাটা বা টাক্রা রোগীদের অপারেশন, স্পিচ থেরাপি বা কথা বলার প্রশিক্ষণ ও অর্থোডন্টিক চিকিত্সা দেওয়া হয়।
 
জন্মগত ঠোঁট ও তালু বা টাক্রা কাটা শিশু সাধারণত গরিবের ঘরেই বেশি জন্মায়। চিকিত্সায় এক বা একাধিক অপারেশন লাগতে পারে। এ চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রইভেট ক্লিনিকে একেকবার অপারেশনে ৬০-৭০ হাজার কিংবা তারও বেশি টাকা খরচ হয়।
 
সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের ব্যাক্তিগত ত্যাগ, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ছাড় ও প্রতি অপারেশনে  ‘স্মাইল ট্রেন’ কর্তৃক প্রদত্ত ২৮০ ডলারের মাধ্যমে ওষুধপত্র-সহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিত্সা করা হয়, অর্থাত্ রোগীদের কোনো খরচ হয় না ।
 
উপরন্তু, সময় সময় অতি দরিদ্র রোগীদের আসা যাওয়ার খরচ, ছোট শিশুদের দুধ, স্কুলগামী শিশুদের বই, স্কুলব্যাগ ইত্যাদিও দেওয়া হয়।
 
বাংলাদেশে স্মাইল ট্রেন
 
বাংলাদেশে ‘স্মাইল ট্রেন’ ২০০৩ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। এদেশে ‘স্মাইল ট্রেন’-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার জন্মগত ঠোঁট ও তালু বা টাক্রা কাটা রোগীর অপারেশন হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
 
স্মাইল ট্রেন-এর বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জনাব মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বে ১৭টি পার্টনার হাসপাতাল, ১৩টি আউটরিচ হাসপাতাল ও বাংলাদেশস্থ ৬টি এনজিও-র মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
 
স্মাইল ট্রেনে-এর সহযোগী এনজিও-সমূহ : চাইল্ড হেল্থ অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন, টিএমএসএস, লায়ন মোখলেছুর রহমান ফাউন্ডেশন, এসএনএডি ফাউন্ডেশন, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, এইডস অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন।
 
জন্মগত ঠোঁট ও তালু বা টাক্রা কাটা রোগীর আপারেশন করতে অভিজ্ঞ চিকিত্সক, যাঁদের প্লাস্টিক সার্জারি অথবা শিশু সার্জারিতে এমএস বা এফসিপিএস ডিগ্রি আছে, তাঁরাই এখানে কাজ করেন।
 
আমি ২০১১ থেকে ‘স্মাইল ট্রেন’-এর সাথে যুক্ত আছি। স্মাইল ট্রেন-এর মাধ্যমে আমি এ পর্যন্ত ৪,০০০ (চার হাজার)-এর বেশি অপারেশন করেছি। অন্যান্য সংস্থা ও ব্যক্তিগত মিলে আমার অপারেশন পাঁচ হাজারেরও বেশি।
 
কাটা ঠোঁট ও ফাটা তালু নিয়ে জন্ম নেয়া কারও অপরাধ নয়, কোনো অভিশাপ নয়। সময়মতো সঠিক চিকিত্সায় এটি সম্পূর্ণ ভালো হয়।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর