মহৎমানস

আছেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৪:৪৬
 
সম্বলহীন অনেক মানুষকে নূর মোহাম্মদ আর্থিক সহায়তা দেন, কিন্তু ওই নির্দিষ্ট পরিমাণ সহযোগিতায় তাদের আপাত সমস্যা মিটলেও তারা আগের মতোই সম্বলহীন রয়ে যেত। এই মানুষগুলোর জন্য কিছুটা হলেও ভবিষ্যতের সম্বল তৈরির লক্ষ্যে ২০০৬ সালে তিনি উপজেলার সোয়া লাখ পরিবারের মধ্যে গাছের চারা বিতরণ করেন এবং পরিচর্যার খরচ দেন। এখনো প্রতিনিয়ত মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের মধ্যে একটি করে বনজ ও ফলদ গাছ বিতরণ করেন তিনি। তাঁর দেওয়া প্রতিটি চারাগাছই এখন বড় হয়ে উঠেছে। এর একটি গাছ বিক্রি করলে ওই পরিবারগুলো কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা পেতে পারে
 
একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে যদি একজন মানুষ সুষ্ঠভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে তাতেই হয়তো জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দৈনন্দিন জীবনে নিজস্ব ব্যস্ততার পাশাপাশি মস্তিষ্কের একটা অংশ জুড়ে এমনই চিন্তা খেলা করে অনেকের। আর সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়ান নিঃস্বার্থভাবেই। আর তেমনি একজন ব্যতিক্রমী মানুষ নূর মোহাম্মদ। নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বাড়ি বাড়ি হেঁটে হেঁটে গাছ লাগান, কখনো স্থাপন করেন টিউবওয়েল কখনো স্যানিটারি ল্যাট্রিন। রোগ, শোক, বন্যা-প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোনো বিপদে গিয়ে পাশে দাঁড়ান এলাকার মানুষের। ঢাকায় ব্যবসা করলেও নিজের অর্জিত টাকার একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন নিজের এলাকা জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় মানুষের কল্যাণে। এ ব্যাপারে তাঁর সহজমত, ‘কেন করব না, আমার উপার্জনের অর্থে ভাগ রয়েছে এই দুঃস্থ মানুষগুলোর। আর সেই ভাগটাই তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি।’
 
দেশে বর্তমানে ৯৭ শতাংশ মানুষ স্যানিটেশনের আওতায় এলেও ২০০৩ সালে এটা ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। সেসময় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকাংশ বাড়ির কোনায় খোলা শৌচাগার দেখা যেত। খালের পাশে, পুকুরের কোনায় থাকত মলত্যাগের স্থান। এমনি একটি প্রত্যন্ত এলাকা ছিল জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা। যেখানে ১০% বাড়িতেও ছিল না স্যানিটারি-ব্যবস্থা, ছিল না বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য টিউবওয়েল। বিষয়টি স্থানীয় প্রতিনিধিদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও নজরে পড়ে এলাকার বিশিষ্ট শিল্পপতি ও দানশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নূর মোহাম্মদের। ২০০০ সালের দিকে যখন ভারতে গিয়েছিলেন, তখন ট্রেনে চড়ে দিল্লি থেকে আজমির যাওয়ার পথে দেখলেন—হাজার হাজার মানুষ রেল লাইনের ওপরই মলত্যাগ করছে। এমনকি কিছু রেলস্টেশনে সকলের সামনেই উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ করছে মানুষ। এই দৃশ্যটি তাঁর নিজের এলাকা জামালপুরের বকশীগঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেয়, সেখানেও মানুষ এমন খালের পাশে, পুকুরের কোনায় খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে। ভারত থেকে দেশে ফিরেই তিনি স্যানিটেশনের ওপর সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। তাঁর উদ্যোগে এলাকার যেসব বাড়িতে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই—এমন ৩৬ হাজার বাড়ি চিহ্নিত করা হয় এবং নিজের অর্থায়নে ২০০৫ থেকে ২০০৮—এই ৪ বছরে স্যানিটেশন বিপ্লব গড়ে তোলেন।  বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে নিজের টাকায় প্রায় ৩৬ হাজার স্যানেটারি ল্যাট্রিন ও ১৪ হাজার টিউবওয়েল বিতরণ করলেও শর্ত ছিল স্বেচ্ছাশ্রমে সবাই নিজের বাড়িতে নিজেরাই বসাবেন স্যানিটারি ল্যাট্রিন আর টিউবওয়েল। তাঁর এমন উদ্যোগে ৪ বছর পর গোটা এলাকার চিত্র বদলে যায়। খুঁজে পাওয়া যায়নি স্যানিটেশন ও টিউবওয়েল ছাড়া একটি বাড়িও।
 
সম্বলহীন অনেক মানুষকে নূর মোহাম্মদ আর্থিক সহায়তা  দেন, কিন্তু ওই নির্দিষ্ট পরিমাণ সহযোগিতায় তাদের আপাত সমস্যা মিটলেও তারা আগের মতোই সম্বলহীন রয়ে যেত। এই মানুষগুলোর জন্য কিছুটা হলেও ভবিষ্যতের সম্বল তৈরির লক্ষ্যে ২০০৬ সালে তিনি উপজেলার সোয়া লাখ পরিবারের মধ্যে গাছের চারা বিতরণ করেন এবং পরিচর্যার খরচ দেন। এখনো প্রতিনিয়ত মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের মধ্যে একটি করে বনজ ও ফলদ গাছ বিতরণ করেন তিনি। তাঁর দেওয়া প্রতিটি চারাগাছই এখন বড় হয়ে উঠেছে। এর একটি গাছ বিক্রি করলে ওই পরিবারগুলো কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা পেতে পারে। এতে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে পাচ্ছে, তেমনি পূরণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধির জন্য প্রত্যেকের বাড়ির আঙিনায় অন্তত একটি করে ফলদ গাছ রোপণের আহ্বান জানান নূর মোহাম্মদ, যা পরবর্তী সময়ে নিজেদের বাড়িকে একেকটি বৃক্ষ খামারে রূপান্তরিত করে অক্সিজেনের ভাণ্ডার হিসেবে গড়ে উঠবে। তিনি স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গাছ রোপণে সকলকে উত্সাহিত করেন। এছাড়াও অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের প্রতিও নূর মোহাম্মদ বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত। প্রতিমাসে এলাকার প্রত্যেক পড়ুয়াদের বিকাশ নম্বরে চলে যাচ্ছে ৫০০ টাকার বৃত্তি। টাকার অভাবে এই উপজেলার কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয় এজন্য চালু করেছেন এই শিক্ষাবৃত্তির। প্রতি মাসে ৪০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ব্যয় বহন করেন তিনি। মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলে উত্সাহ জোগাতে পুরস্কারের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।  
 
এ বছর গোটা জামালপুর জেলা বন্যায় ভয়াবহ রূপ নেয়। প্লাবিত হয় জামালপুর সদর ও বকশীগঞ্জ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা।  সব মিলিয়ে জেলার ৭টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ডুবে যায় ৫ হাজার হেক্টর রোপা আমন ধান। আর ফসল ডুবে যাওয়ায় উপজেলার কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তখনও বন্যাদুর্গত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ান নূর মোহাম্মদ।  উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বাঁচাতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকায় ১০ হাজার কেজি উন্নতমানের বোরো ধান ও গম বীজ বিতরণ করেন তিনি। এই বীজ দিয়ে কৃষকরা ১০ হাজার একর জমি চাষ করতে পারবেন। এর ফলে কৃষকের ঘরে উঠবে ৫ লাখ মণ ধান ও গম। অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস জোগান তিনি।
 
এমনই নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে নূর মোহাম্মদ স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে দানশীল হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। এলাকাবাসী রোগ-ভোগ, সুখ-দুঃখে নিয়মিতই তাঁকে কাছে পায়। এমন কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসাও অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৭৪ সালে বকশীগঞ্জের স্থানীয় স্কুল থেকেই মেট্রিক পাস করেন নূর মোহাম্মদ, কলেজজীবন পেরিয়ে বিএ পাস করার পর, আইন বিভাগে পড়াশোনা করার ইচ্ছা থাকলেও তা আর করা হয়নি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যেস বা ইচ্ছে তাঁর তখন থেকেই। ব্যবসার শুরুর থেকেই আয়ের একটি অংশ তিনি স্থানীয় দরিদ্র মানুষের জন্য খরচ করতেন এবং ক্রমান্বয়ে নিজের ব্যবসায়িক জীবনের উন্নতির সাথে সাথে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে আরও বেশি সচেষ্ট হন। নূর মোহাম্মদ ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ছাত্রজীবন শেষ হলে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী যুবলীগে যুক্ত হয়ে দুর্দিনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তী সময়ে মূল দল আওয়ামী লীগের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। অবশেষে দক্ষ সংগঠক হিসেবে ২০০৩ সালে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
 
ঈদ ও পূজা-পার্বণে সহযোগিতা ছাড়াও তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও উন্নতকরণে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রয়োজনে বরাবরই তাঁকে পাশে পেয়েছে এলাকার মানুষ। আর তাই সুবিধাবঞ্চিত মানুষেগুলোর আস্থা ও ভালোবাসার আরেক নাম নূর মোহাম্মদ।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর