সাফ অনূর্ধ্ব—১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশের কিশোরীরা একটানা প্রায় দুই বছর অনুশীলন ক্যাম্পে ছিলেন। ক্যাম্পে দুইটা ঈদ করতে হয়েছে। ক্যাম্পে থাকলেও তাদের জন্য ছিল লেখাপড়ার বিশেষ ব্যবস্থা। বাংলা, অংক, ইংরেজির শিক্ষক। বাফুফের ফুটবল ক্যাম্পের চার দেয়ালে শৃংখলবন্দি থাকা সেই কিশোরীরা আজ থেকে ছুটিতে যাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা এনে দেওয়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা গতকাল সোমবার বিকালেই ক্যাম্প ছাড়তে শুরু করে। তাদের চোখেমুখে রোশনাই। সাফল্যের হাসি। নিষ্পাপ ফুটফুটে মেয়েগুলোকে সামনে থেকে দেখলে একটুও বুঝার উপায় নেই তারা বিজয়ের মাসে দেশের মানুষদের অপ্রত্যাশিত সাফল্য উপহার দিয়েছেন। ফুটবল ময়দানের সফল যোদ্ধা তারা। নেপাল, ভুটানকে হারিয়ে একই টুর্নামেন্টে ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে পরপর দুই বার হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
দলের গোল-কিপার মাহমুদা আক্তার, আনাই মগিনি, শামসুন নাহার, নাজমা, আঁখি, নিলা, মনিকা, মারিয়া মান্ডা, আনুচিং, তহুরা, মার্জিয়ারা নারী ফুটবলে পথপ্রদর্শক। এই ফুটবলাররা এখন স্বপ্ন দেখান অন্যদের। তাদের সাফল্য দেখে অন্যরা এগিয়ে আসবে ফুটবলে। স্বপ্ন দেখেন নিজেরা আগামীতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আরো বড় আসরে নাম লেখাবেন। বড়দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা জানিয়ে গেলেন তার চোখে নারী ফুটবল নিয়ে আঁকা ছবিটা। বললেন, ‘এদেশের ফুটবলে নারী জাগরণ শিক্ষা, সমাজ-সংসার, পরিবারসহ সব শ্রেণিতে নারীর অবস্থান মজবুত করবে। আমরা যত বেশি ভালো ফুটবল খেলব, ঘরে ঘরে তত বেশি নারীর সম্মান বৃদ্ধি পাবে।’
যারা বাংলাদেশের ফুটবলে ট্রফি এনে দিয়েছেন তারা সবাই গ্রামের। হতদরিদ্র ঘরের সন্তান। ঘরবাড়িও ভালো না। বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের বাবা কৃষিকাজ করেন, অটো চালান, তাঁতের কাজ করেন। এই সব পরিবারের মেয়েদের দিয়ে সাফল্য আনতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন। সাবেক এই ফুটবলার ২০১০ সাল হতে কোচ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘যখন শুরু করেছিলাম তখন ভাবতাম কতো কম গোল খাবো। আর এখন ভাবি কতো গোলে জিতব। আমাদেরকে আরো উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
ময়মনসিংহের ৮, রংপুরের ৩, ঠাকুরগাঁওয়ের ৪, খাগড়াছড়ির ৩, রাঙ্গামাটির ২, কুষ্টিয়ার ২ এবং সিরাজগঞ্জের ১ জন মেয়ে সাফে লড়াই করেছেন।
সাফের গোল্ডেন বুট সিরাজগঞ্জের মেয়ে আঁখি খাতুনের হাতে। সেরা পুরস্কার পেয়ে খুব খুশি আঁখি বলেন, ‘প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হয়েছি, এটা ভালো লাগছে। সেরা খেলোয়াড় হবো চিন্তা করিনি। গোল্ডেন বুট অন্য কেউ জিতলেও আফসোস থাকতো না। সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি এটাই বড় কথা। আগামীতে এরচেয়েও বড় ট্রফি জিততে চাই।’
রাইট উইঙ্গার মার্জিয়া খাতুন গোল করিয়েছেন। ছিলেন প্রতিপক্ষের ত্রাস। নেপাল, ভুটান এবং ভারতের খেলোয়াড়রা তাকে রুখতেই পারেনি। মার্জিয়া বললেন, ‘আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় দেশের মানুষ জেনেছে আমরা মেয়েরা ফুটবল খেলছি।’ এই প্লেমেকার বলেন, ‘ফুটবল ক্যাম্প আমাদের বাসা বাড়ির মতো। ফুটবলের প্রতি আমাদের ডেডিকেশনটা এমনই যে কখনও ফেসবুক নিয়েও আমরা বসি না।’ আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১৫টি গোল করেছেন মার্জিয়া। জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং থাইল্যান্ডে গিয়েছেন খেলতে।
ভারতের বিপক্ষে ফাইনালের একমাত্র গোলদাতা শামসুন নাহার। কাল দুপুরে বাফুফে ভবনে শামসুন নাহারকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের ভিড় উপচে পড়ল। ফাইনাল নিয়ে শামসুন নাহার বললেন, ‘এক গোলের কোনো ভরসা নেই। যে কোনো সময় গোল খেয়েও যেতে পারতাম। আমি ভয়ে ছিলাম। কারণ প্রতিপক্ষের নাম ভারত।’
আগামী দিনের ফুটবলারদের বাঁক বদলে দিয়েছে সাফের ট্রফি। শামসুন নাহারদের নিয়ে আগামী দিনের ভাবনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। আর সেই পরিকল্পনা শুনে মুগ্ধ শামসুন নাহার বলেন, ‘দুই বছর পরিশ্রম করার ফল পেয়েছি। চার বছরের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তো আরো বেশি ফল পাবো আমরা।’
সাফের ট্রফি জয় করে রাতে হোটেলে ফিরে কেক কেটে উদযাপন করেছে মেয়েরা। কেক কাটার আনন্দ দারুণ লেগেছে দলের স্ট্রাইকার তহুরা খাতুনের। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৬ গোল করেছেন তিনি। সাফেও গোল আছে। ফাইনালে প্রথম ৫৫ সেকেন্ডে তহুরা গোল করলেও রেফারি বাঁশি বাজাননি। কষ্ট পেয়েছেন মুক্তগাছার মেয়ে তহুরা। বলছিলেন, ‘ভারতের গোলকিপারের হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া বলে টোকা দিয়ে গোল করলাম। রেফারি বলল হয়নি।’
ফুটবল খেলে দেশকে শিরোপা উপহার দিতে চান খেলোয়াড়রা। সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদের ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবতে চান। বাফুফে কাল জানিয়েছে তারা উদ্যোগ নেবে। তা শুনে দলের সফল অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা বললেন, ‘ফুটবল লিগ হলে ভালো হবে। আমরা টাকা পাবো। তবে হ্যাঁ ফুটবল খেলায় সবচেয়ে বেশি দরকার শৃংখলা।’
সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খেলোয়াড়রা ক্লান্ত। দুপুর গড়িয়ে। ছুটি পেয়ে আর কথা বলতে ভালো লাগছে না তাদের। সাফ চ্যাম্পিয়ন তহুরা, মার্জিয়া, ঋতু, সাজেদারা ছুটলেন বঙ্গবাজার মার্কেটে। কেনাকাটা করবেন। খেলোয়াড়রা অনেক দিন পর আনন্দে ভাসছে। তারা যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে। আবার নতুন কোনো স্বপ্নের আশায়।
ইত্তেফাক/নূহু
ইত্তেফাক/নূহু
