চিতলমারীতে দখলদারদের কবলে নদী-খাল

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০১:৪৮

এক সময়ের খরস্রোতা চিত্রা, বলেশ্বর নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। এ অবস্থায় এলাকার অর্ধশত শাখা খাল এখন নাব্যতা হারিয়ে মরতে বসেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির দখলবাজ লোকজন রাতারাতি দখল করে নিচ্ছে খাল ও নদীতে জেগে ওঠা চরের জমি। এ পরিস্থিতিতে চাষাবাদ ও নৌযোগাযোগ এখন চরম হুমকির মুখে। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার অধিকাংশ নদী-খাল এখন এভাবে দখলদারদের কবলে চলে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চাষিরা ও এলাকার সচেতন মহল।    

এলাকাবাসী জানান, বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার অধিকাংশ খাল ও নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীন হতে বসেছে। ফলে কৃষি প্রধান এ অঞ্চলের নৌযোগাযোগ ও চাষাবাদ এখন চরম হুমকির মুখে। এ অবস্থায় হাজার হাজার চাষিদের পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ। ফলে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এসব নদী ও খাল পুনঃখননসহ দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।

সরেজমিনে জানা যায়, গত ৩০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের নদী ও খাল খনন না করার ফলে এর অধিকাংশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে চিতলমারী সদর বাজারের হক ক্যানেলসহ বেশকিছু স্থানে খালের পাশে বসবাসকারী কয়েক প্রভাবশালী যে যার মত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করে নিচ্ছে সরকারি খাল। এছাড়া ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে খালটি। ফলে চিতলমারী সদর বাজারের পাশের একমাত্র এ খালটিতে এখন হাঁটু পানিও নেই। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সদর বাজারসহ আশ-পাশ এলাকায় বসবাসকারীদের। উপজেলার বড়বাড়িয়া, কলাতলা, হিজলা, শিবপুর, চিতলমারী সদর, চরবানিয়ারী ও সন্তোষপুরসহ সাতটি ইউনিয়নে প্রধান ৩টি নদী ও ৫০টি খাল এবং শতাধিক শাখা খাল রয়েছে। যার অধিকাংশ এখন নাব্যতা সংকটে। এক সময়ের মধুমতি, চিত্রা ও বলেশ্বর নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীন প্রায়। এসব নদী এখন কালের সাক্ষী মাত্র। এসব নদী থেকে উঠে আসা হক ক্যানেল, পাটনিবাড়ি, পেত্নীমারী, নারাণখালী, বাঁশতলী, খাগড়াবুনিয়া, শরত্খালীসহ প্রায় ৫০টি খাল ও শতাধিক শাখা খালের একই অবস্থা।   

এসব নদী ও খালে নাব্যতা সংকট দেখা দেওয়ায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এর অধিকাংশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে ঠিকমত জোয়ার-ভাটার পানি ওঠা-নামা না করার ফলে সেচ মৌসুমে চাষিরা ফসলে ঠিকমত পানি পাচ্ছেন না। ফলে বোরো মৌসুমে চাষাবাদ নিয়ে চিন্তিত এসব চাষিরা। এতে নৌযোগাযোগ ও কৃষি কাজ এখন হুমকির মুখে। চিতলমারী সদর বাজারের পাশ থেকে বয়ে যাওয়া হক ক্যানেলসহ বেশ কিছু স্থানে সীমানা সংলগ্ন খালের পাশে বসবাসকারী প্রভাবশালী লোকজন সরকারি খালটির বেশিরভাগ অংশ দখল করে নিয়েছে। ফলে খাল থেকে নৌযোগাযোগ অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া জোয়ার-ভাটার পানি ঠিকমত ওঠা-নামা করতে না পারায় বোরো মৌসুমে চাষিরা ঠিকমত ফসলের পানি দেওয়ার ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

 এ অবস্থায় উপজেলার কুরালতলা, শিবপুর, কালশিরা, বারাশিয়া, আড়য়াবর্ণীসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ গ্রামের কয়েক হাজার চাষিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি চিতলমারী সদর বাজারে আসা-যাওয়ার জন্য কৃষিপণ্যসহ মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য নৌকায় করে চলাচলে দারুণ বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। দখলদারদের কারণে খালটি এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় খালটি দখলদার মুক্ত করতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকার সচেতন মহল।

শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোহাসীন রেজা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শেখ রুস্তম আলী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক চন্দ্র শেখর মিস্ত্রিসহ অনেকে জানান, এভাবে খাল দখল হতে থাকলে আগামী কিছুদিনের মধ্যে এলাকায় নদী ও খালের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না এবং চাষাবাদের পানি মিলবে না। একই সাথে এ সকল খাল পুনঃখননের জন্যও জোর দাবি জানান। সদর ইউনিয়নের পন্টু বিশ্বাস, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস, দেবাশিষ মহলসহ এলাকার চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দখলবাজদের কারণে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন জোয়ার-ভাটার পানি ঠিকমত উঠতে না পারায় চাষাবাদ নিয়ে চরম চিন্তিত। বোরো মৌসুমে সেচ পানি নিয়ে এখনই দিশেহারা চাষিরা।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবুল হাসান জানান, যেহেতু এটা শুকনো মৌসুম এ সময়টায় কেবলমাত্র সেচ পানির ওপর চাষিদের নির্ভর করতে হয় তাই নদী ও খালে পানির সমস্যা হলে সেচ কাজ ব্যাহত হবে। এর জন্য চাষিদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।

জেলা প্রশাসক তপন কুমার বিশ্বাস জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে। শীঘ্রই খাল খনন ও দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু