জমির উপরের মাটি পুড়ছে ইটভাটায়, পরিবেশ বিপর্যয়

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:৫০
 
নওগাঁ সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর গ্রামের মো. আলতাফ হোসেন বলেন, 'আমি এখন প্রায়ই সময় অসুস্থ থাকি। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফুসকুনি বের হয়েছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আগে কখনো আমার এমন রোগ হয় নাই। ডাক্তার বলছেন ইট ভাটার ছাই ও ধোঁয়ার কারণে আমার এই রোগ হয়েছে। শুধু আমি নই ইদানীং আমার আশেপাশের অনেক মানুষকেই এই সব রোগে আক্রান্ত হতে দেখছি। শুধু মানুষই নয় আগে আমার যে জমি থেকে ১৮-২০ মন সবজি পেতাম এখন জমির পার্শ্বে ইট ভাটা হওয়ার করণে ফলন ১০-১২ মনে কমে এসেছে।'
 
জমির উর্বর শক্তিকে ইটভাটার আগুনে পোড়ানো হচ্ছে নির্বিচারে। নষ্ট করা হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যকে। তবুও নীরব ভূমিকায় সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোন কিছু তোয়াক্কা না করে জমির উপরের উর্বর মাটি কেটে প্রতিনিয়তই ইট বানানো হচ্ছে নওগাঁর ইটভাটাগুলোতে। ভাটা মালিকরা সামান্য কিছু টাকা দিয়ে জমির মালিকের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে উপরের মাটি কাটার কারণে জমির উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে নওগাঁয় বর্তমান ১৩৫টি ইট ভাটার মধ্যে মাত্র ৬৮ ইটভাটার বৈধ ছাড়পত্র রয়েছে। বাকিগুলো ম্যানেজার ওপর চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম।
 
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নওগাঁয় গত বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শতাধিক ইট ভাটা ইট প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। জেলার ১১টি উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে আবাসিক এলাকা ও আবাদি জমির আশেপাশে। আবার এসব ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করার জন্য আবাদি জমির উপরের উর্বর মাটি কেটে তোলা হচ্ছে। এতে করে জমিগুলো তার ফসল ফলানোর ক্ষমতা স্থায়ী ভাবে হারিয়ে ফেলছে।
 
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, জমির উপরের মাটি ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপরের মাটি হলো অনুযৌবিক এর ফলে জমির উর্বরতা নির্ভর করে থাকে। কেউ যদি জমির ৬ ইঞ্চি মাটি কেটে নেয় তাহলে জমির উর্বরতা কমে যাবে যার ফলে জমির ফলনও কম হবে। উপরের মাটি কাটার ফলে জমির স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে ৫-৭ বছর সময় লাগে। জমির উপরের মাটি না থাকলে মাটির জৈবশক্তি কমে গিয়ে  দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষকরা। ভাটার মালিকরা সামান্য লাভে কৃষকদের কাছ থেকে জমির উপরের মাটি কিনে নিচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করছে। যার প্রভাব পরিবেশের উপর পড়তে শুরু করেছে।' তিনি আরো বলেন, 'অমরা ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছি। এছাড়াও ভাটার ছাইয়ের কারণে আম ও কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলদ গাছের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে যার ফলে ফলন কম হচ্ছে। পরিবেশ নীতিমালায় বলা হয়েছে উর্বর জমির মাটি ব্যবহার এবং আবাদ হয় এমন এলাকায় ভাটা করা যাবে না। কিন্তু নওগাঁর বেশির ভাগ ইটভাটা এসব নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। ভাটায় ব্যাপক হারে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানী কাঠ। এসব ইটভাটার ছাই উড়ে গাছের মড়কসহ ভাটা এলাকায় ফসলের ফলন ও কম হচ্ছে। এতে ক্ষতি হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদি।
 
নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, '১০ কাঠা জমিতে শিম লাগিয়েছিলাম। কিন্তু পার্শ্বের ইটভাটা থাকায় তার ফলন বিপর্যয় হয়েছে।' তিনি আরো বলেন, 'ডাব গাছে ভাটার ছাই পড়ার কারণে ডাবের গুটিও ঝরে যাচ্ছে।' রাণীনগর উপজেলার চকমনু গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, 'প্রতি বছর আমার কয়েক বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুইটি ইট ভাটার কারণে। তারা যে ক্ষতিপূরণ দেয় তা খুবই কম। আমি একাধিক জায়গায় অভিযোগ দিয়েও কোন ফল পাই নাই।'
 
স্থানীয় একটি ব্রিক্স ফিল্ডের ম্যানেজার রিপন হোসেন বলেন, আমরা সাধারণত জমির উপরের মাটি কাটতে চাই না। অনেকটা বাধ্য হয়েই উপরের মাটি কাটি। দোঁয়াশ, এঁটেল ও বেলে মাটির সংমিশ্রণে ইট তৈরি করতে হয় এদের কোনটি কম হলে ইট শক্ত এবং মান সম্মত হবে না। আবার সব ধরণের মাটির সংমিশ্রণ না থাকলে ইটের গুণাগুণও ঠিক থাকে না। জমির উপরিভাগের মাটি নিলে জমির ক্ষতি হয় কিনা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'জমির কিছুটা ক্ষতি হয়। ব্যবসা টিকে রাখার জন্য অনেকটা নিরুপায় হয়েই জমির উপরের মাটি কাটতে হচ্ছে।'
 
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, আমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি নিয়ম বহির্ভূত কোন ইট ভাটা বদলগাছীতে না রাখার জন্য। জমির উপরের মাটি যেন ভাটার মালিকরা নষ্ট না করে সেই বিষয়ে আমি প্রশাসন পক্ষ থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
 
IMG0
 
সদ্য বিদায়ী নওগাঁ জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান বলেন, 'যে সব ভাটার মালিক পরিবেশের বিধান মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।' তাছাড়া জমির উপরের মাটি কেটে যেন ইট তৈরি করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তিনি বলেন।প্রয়োজনে হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার করে পরিবেশ আইনে মামলা করা হবে বলে তিনি জানান।
 
ইত্তেফাক/জামান