রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেছেন, শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের যে পথ আমরা পরিক্রমণ করছি, তা আমাদেরকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশ্বসভায় ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক অবস্থানে সমাসীন হয়েছে। অচিরেই একটি উন্নত দেশ হিসেবে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের মাধ্যমে শোষণমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বাঙালি জাতিকে আবারো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল রবিবার বিকালে দশম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অধিবেশনে অধিকাংশ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যা ৬টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সংসদ অধিবেশনে প্রবেশের সময় বিউগলে তার আগমনী বার্তা বাজানো হয়। অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এ সময় বিউগলে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। অধিবেশনে প্রবেশ করেই রাষ্ট্রপতি স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনে আসন গ্রহণ করেন।
এরপর ৬টা ৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি তার ১৫৭ পৃষ্ঠাব্যাপী ভাষণের সংক্ষিপ্ত সার তার ভাষণে উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বর্তমান সরকার গত চার বছরের উন্নয়ন-সফলতাগুলো বিস্তারিতভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শেষ করেন। এরপর স্পিকার সংসদ অধিবেশন আগামীকাল মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা সমুন্নত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখতে হবে। শোষণমুক্ত সমাজ-প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে বাঙালি জাতিকে আবারো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরাম্বিত করার মধ্য দিয়ে আসুন আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।
২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্য-আয়ের দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিম্নমধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এখন জাতির দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে ২০৪১ সালের দিকে- বিশ্বসভায় একটি উন্নত দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার মানসে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকার উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রেখে জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণে সফল হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫-২০ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
আব্দুল হামিদ বলেন, দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জাতির পিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারী পলাতক খুনীদের আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলমান আছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর্যায়ে আছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করছে এবং বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থ-বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় পূর্ববর্তী অর্থ-বছর হতে ১৪৫ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন, একই সময় রপ্তানি আয় ৩৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সকল লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকার দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহিমূলক ও সেবামুখী জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মসম্পাদনে মেধাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী কাজের জন্য জনপ্রশাসন পদক প্রবর্তন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সকল এজেন্ডা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি দপ্তরে উপযুক্ত ও দক্ষ জনবল নিয়োগে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। ইউনেস্কো কর্তৃক জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি সংসদে তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, জাতির পিতার বজ্রনিনাদিত ভাষণ মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের বাঙালির জন্য চিল নিরন্তর উদ্দীপনার নিরন্তর উত্স ও সঞ্জীবনী শক্তি।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ১০৬৭ পূর্ব সীমানার ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাষ্ট্রপতি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ তুলে ধরে এর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরে দ্রুত কার্যক্ররের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর কর্তৃক প্রচারিত ভিডিও প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ’মাদার অব হিউম্যানিটি’ অভিধায় অভিহিত করা হয়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি।
এদিকে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি ও ইবি (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর মো. আব্দুল হামিদ গতকাল রবিবার কুষ্টিয়ায় বাংলদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ দেন। অনুষ্ঠানে ৫টি অনুষদের ৯ হাজার ৩৭২ জনকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সনদ প্রদান করা হয়। এছাড়াও ৮১ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীকে স্বর্ণ পদক প্রদান করা হয়। সমাবর্তন বক্তৃতায় অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল মান্নান, ইবি’র ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
ইত্তেফাক/নূহু
