চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের পশ্চিম অংশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বড়বিলে এবার সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হতে চলেছে। বছরের আটমাস এই বিলে পানিতে থাকে টইটম্বুর। ফলে এলাকার হাজারো কৃষক পানি নিষ্কাশনের অভাবে এখানে চাষ করতে পারেন না। যুগ যুগ ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকছে বড়বিলের হাজারো একর জমি। ইতোপূর্বে এলাকাবাসীর তরফ থেকে প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন করা হয় যাতে বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য এখানে একটি স্থায়ী সেচ স্কিম বসানোর হয়। কিন্তু অধিক ব্যয়ে এই প্রকল্পটি এখনো চালু করতে পারেনি প্রশাসন। ফলে বড়বিলের বিশাল আয়তনের এই জমি প্রতিবছর রয়ে যাচ্ছে অনাবাদি।
আশার কথা হচ্ছে, জলাবদ্ধ সেই বিল এখন হারবাং ও বরইতলী ইউনিয়নের মানুষের কাছে সম্ভাবনার নতুন গল্প হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে বড়বিলের পানিতে ফোটা জাতীয় ফুল শাপলা বিক্রি করেই জীবিকা চালাচ্ছে অন্তত ৫০টির অধিক পরিবার। বলা চলে এসব পরিবার সদস্যদের বর্তমান জীবন ধারণ চলছে শাপলা বিক্রি করেই।
স্থানীয় বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা কক্সবাজার জেলা পরিষদের সদস্য লায়ন কমরউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমসহ প্রায় আটমাস ধরে জলাবদ্ধতায় টইটম্বুর থাকে এক হাজার হেক্টর বিশিষ্ট আয়তনের ঐতিহ্যবাহী হারবাং বড়বিল। এতে এসব জমির মালিকরা আর্থিকভাবে টানাপড়েনে থাকেন। ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় রূপ নেওয়ায় বছরের দুই মৌসুমে ধান এবং সবজি ফলানো থেকে বঞ্চিত হন কয়েকশত কৃষক। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপরিকল্পিত হওয়ায় এবং বড়বিল সংলগ্ন ছড়াখালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ এই কৃষি জমির সঠিক ব্যবহার করতে পারছেন এসব হতভাগা কৃষক।
অবশ্য এই হতাশার মাঝেও আছে আশা জাগানিয়া খবরও। প্রতিবছর অন্তত আটমাস পর্যন্ত এই বড়বিল যখন ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় টইটম্বুর থাকে, তখন সেখানে কাউকে জাল ফেলে মাছ ধরতে এবং আবার কাউকে বিলের শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহও করতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই বড়বিল থেকে শুধুমাত্র শাপলা তুলে জোগাড় হচ্ছে অন্তত ৫০ পরিবারের জীবিকা। প্রতিবছরের আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই বিল থেকে শাপলা পাওয়া যায়। অবশ্য এর পর শুষ্ক মৌসুমে (চলতিসময়) পানি শুকিয়ে গেলে সেখানে কৃষকেরা নামে রকমারী সবজি, তরমুজ, বাঙ্গি ও ধান চাষে।
বড়বিলের কাছের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বছরের সাত-আটমাস ধরে তারা হারবাং বড়বিলের উপরই নির্ভরশীল। কেউ শাপলা বিক্রি এবং কেউবা মাছ ধরে তা বাজারে বিক্রি করে পরিবারের ভরণ-পোষণ মেটাচ্ছেন। এভাবে অন্তত ৫০ পরিবার শাপলা তুলে এবং আরো প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার বড়বিলের মাছ ধরে আসছেন।
IMG0
সরেজমিনে দেখা গেছে, হারবাং ইউনিয়নের পুরো এই বড়বিলের ৮০ শতাংশ জমি ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় তলিয়ে রয়েছে। সেখানে দুরন্তপনা শিশু, কিশোর-কিশোরীরা বিলে মাছ ধরছে। আবার বয়োজ্যেষ্ঠরা আগাছা পরিষ্কারের অংশ হিসেবে বিল থেকে শাপলা তুলে নৌকায় করে সড়কের ধারে এনে স্তুপ করছেন।
ঐতিহ্যবাহী হারবাং বড়বিলে কখন থেকে শাপলা ফুটছে তার নির্দিষ্ট সময় কেউ সঠিক করে বলতে না পারলেও স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, তাদের জন্মের পর থেকে এই বিলে শাপলা দেখে আসছেন। বড়বিল থেকে শাপলা তুলে তা স্থানীয় বাজার ছাড়াও কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সরবরাহ করছেন। বিনিময়ে অনেকে প্রতিদিনি সাতশত থেকে ৮শ টাকা আয় করছেন। এই শাপলা বিক্রির আয় দিয়ে ভালভাবেই চলছে তাদের সংসার।
হারবাং বড়বিল থেকে প্রতিদিন শাপলা তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহকারী দুইজন কৃষকের সাথে কথা হয় অতিসম্প্রতি। তাদেরই একজন হারবাং এর ডবলতলী গ্রামের শাহাব উদ্দিন ও অপরজন শাহ আলম।
তারা বলেন, গরমের সময় সারাদিন কাঠফাটা রোদ বা বর্ষা মৌসুমে মুষলধারে বৃষ্টি হলেও প্রতিদিন তারা এই বড়বিলে আসেন শাপলা তুলতে। আমাদের মতো আরো অন্তত অর্ধ শতাধিক পরিবার এই বড়বিলের শাপলার ওপরই নির্ভরশীল। প্রতিদিন শাপলা তুলে তা বিক্রি করে আয় করছি ৭শ থেকে ৮শ টাকা।
তারা জানান, প্রতিবছর ৭-৮ মাস পর্যন্ত এই বড়বিলের বিশালায়তনের কৃষিজমি ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত থাকে। এতে কৃষকের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না। তাই গত দশবছর ধরে এই বিল থেকে নিয়মিত শাপলা তুলে স্থানীয় এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। আর বিপরীতে ভাল আয় হচ্ছে তাদের।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক উল্লাহ জানান, শাপলা আসলে কোন কৃষি পণ্যের আওতায় পড়েনা। শাপলা প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় পরিষ্কার পানির কৃষি জমি, পুকুর বা ডোবাতে। শাপলা তিন প্রজাতির হয়ে থাকে। তন্মধ্যে সাদা, লাল ও বেগুনী রঙের। সাদা প্রজাতির শাপলা ফুল সবজি হিসেবে ও লাল রঙের শাপলা ব্যবহার হয় ঔষধি কাজে। শাপলা খুবই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সবজিও। সাধারণত শাক-সবজির চেয়েও এর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। তাই বাজারে এই শাপলার কদরও রয়েছে বেশ। সেই শাপলা বিক্রি করে এখানকার অন্তত ৫০ পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছেন।
কৃষিবিদ আতিক উল্লাহ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, এই বড়বিলের বিপুল পরিমাণ কৃষি জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে।’
ইত্তেফাক/এমআই
