রাজধানীতে শুধু ইয়াবা বিক্রি নয়, নতুন নতুন ক্রেতা সংগ্রহে রয়েছে কয়েক’শ ‘ম্যানেজ কর্মী’। যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তরুণ-তরুণীদের ম্যানেজ করে ইয়াবা সেবনে উত্সাহিত করে থাকে। এসব ম্যানেজ কর্মীদের সংগ্রহের (নতুন ইয়াবা সেবী) উপর কমিশন দেওয়া হয়ে থাকে। ইয়াবা সেবনে নতুন যারা আকৃষ্ট হয় তাদের কাছ থেকে ভালো দামও পাওয়া যায়। এ তথ্য জানিয়েছেন সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর টিমের হাতে গ্রেফতারকৃত মাদক ব্যবসায়ী মোছাম্মদ মিনারা ওরফে শাহনাজ বেগম ওরফে শাহীনুর বেগম ওরফে মোছাম্মদ দিনারা (৪২)। রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকার রেল বস্তিতে বেড়ে ওঠা মিনারা গত ২০ বছর ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে অর্ধশত বার। তবে অধিকাংশ সময় পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে ছাড়া পেয়েছে। তার বিরুদ্ধে শুধু নিউমার্কেট থানায় রয়েছে ১৭টি মামলা। কিন্তু সর্বশেষ ইয়াবাসহ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের টিমের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একটি মামলায় আদালতে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে।
গ্রেফতার হওয়ার পর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চল (উত্তর) তদন্ত টিম তাকে রিমাণ্ডে এনে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে মিনারা জানিয়েছেন, তার অতীত, বর্তমান। ভয়াবহ জেনেও কেন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে তার আদ্যোপান্ত। মামলার এজাহারে গ্রামের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে শরীয়তপুর জেলার গুচ্ছগ্রাম কামার দা। স্বামীর নাম বাবু ওরফে মোবাইল বাবু ওরফে বাবুল সরকার ওরফে শহিদুল। বর্তমান ঠিকানা নীলক্ষেত বাবুপুরা (বিসিএস কোয়ার্টার সামনের বস্তি)।
জিজ্ঞাসাবাদে মিনারা জানায়, তার জন্ম বেড়ে ওঠা কাওরান বাজার রেল বস্তি। এক সময় কাওরান বাজারে আড়ত্দারদের কাছ থেকে ফেলে দেওয়া সবজি সংগ্রহ শেষে তা বিক্রি করে পরিবারকে সহায়তা করতো। এ অবস্থায় বিয়ে হয়। আর স্বামীর ইন্ধনে এক সময় জড়িয়ে পড়ে মাদক ব্যবসায়। শুরুতে রেল লাইনের ধারে ফেনসিডিল, গাঁজার পুরিয়া বিক্রি করতো। পরবর্তীতে সব ছেড়ে ইয়াবা। ইয়াবার ‘বড় ব্যবসায়ীরা’ তাকে নির্ধারিত সংখ্যা ইয়াবা দিত। ওটা বিক্রির পর পেত কমিশন। এ অবস্থার মধ্যে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক হয়।
পরে পুলিশকে ম্যানেজ করে গ্রেফতার ও মামলা থেকে রেহাই পায়। আর ওই ঘটনার পর পুলিশের সাথে একটা ‘সমঝোতা’ হয়। ফলে বছরখানেক ভালোই কাটছিল। কিন্তু ইয়াবা বিক্রি নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে রেল বস্তি ছেড়ে বসবাস শুরু করে রামপুরায় ঝিলপাড় বস্তিতে। সেখানেও একই সমস্যা দেখা দেয়। ফলে আবারও স্থান পরিবর্তন করে কদমতলী এলাকায় বসবাস শুরু করে।
মিনারা জানায়, মাদক ব্যবসা এমনই যার যার নির্ধারিত এলাকায় অন্যদের ব্যবসা করাটা ভীষণ জটিল। মাস্তান, পুলিশকে ম্যানেজ করেই করতে হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সাল থেকে নীলক্ষেত এলাকার বাবুপুরার শাহবাড়ী বস্তিতে বসবাস শুরু করে। ওই বস্তিতে নিজেই তৈরি করে একটা বড় মাপের মাদক সিন্ডিকেট। তবে গত চার বছরে তাকে ১৬ বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুদিন জেল খাটার পর জামিনে বেরিয়ে আবারও ফিরে এসেছে ইয়াবা ব্যবসায়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জিজ্ঞাসাবাবাদে মিনারা জানায়, নীলক্ষেত এলাকায় রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকজন ম্যানেজ কর্মী। তারা নতুন নতুন ইয়াবা ক্রেতা টার্গেট করে। যাদের সিংহভাগই তরুণ। কথাবার্তায় মিলে গেলে সুবিধামত নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হতে বলে। পরে তাদের চাহিদা মতো ইয়াবা তাদের হাতে তুলে দেয়। মিনারা আরও জানায়, তার মতো দীর্ঘদিন ধরে যারা ইয়াবা ব্যবসা করছে তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ম্যানেজ কর্মী।
ইয়াবা সংগ্রহের ব্যাপারে মিনারা জানায়, আগে যেভাবে ইয়াবা ঢাকায় আনা হতো, তার ধরন বর্তমানে পাল্টেছে। কারণ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ধরা পড়ার ভয়ে ইয়াবা বহনকারী পেটে করে ইয়াবা বহন করে ঢাকা নিয়ে আসছে। ইয়াবা বহনের জন্য প্রাপ্ত বকশিশ নিয়ে আবার তারা ফিরে যায় কক্সবাজারে। মিনারাকে গ্রেফতারে নেতৃত্বদানকারী মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের (উত্তর) সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, গ্রেফতারকৃত মিনারাই নীলক্ষেত এলাকার ইয়াবা সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। দশটির অধিক নাম ব্যবহার করতো।
ইত্তেফাক/নূহু
