রাণীনগরের আদর্শ গ্রাম এখন অবৈধ কার্যক্রমের আখড়া

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:৫২
 
'আমার দ্বিতীয় ছেলে সোহেল এক সময় দোকান দিয়ে ফলের ব্যবসা করতো। সবার অজান্তে সে গ্রামের মাদকাসক্ত ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করায় আজ প্রায় তিন বছর যাবত সে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। সে ফলের দোকান লাটে তুলে দিয়ে আমার পরিবারকে সর্বশান্ত করে ফেলেছে। নেশার টাকা না পেলে সে পাগল হয়ে যায়। বাড়িতে রাখা ঘরের জিনিসপত্র ভেঙ্গে সাবাড় করে দেয়। সোহেলকে নিয়ে আমি এখন মহা বিপদে রয়েছি। আমার সোনার ছেলে এই গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামের কিছু মাদকাসক্ত ছেলেদের সঙ্গে মিশে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এখন কি করবো তা ভেবে পাই না।' এই কথাগুলো বলেন নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা ফল ব্যবসায়ী মেছের আলী তার মাদকাসক্ত ছেলে সোহেল সম্পর্কে। শুধু মেছের আলীই নন এই গ্রামে এরকম শতাধিক অভিভাবক রয়েছেন যারা বর্তমানে একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।
 
তাই রাণীনগর উপজেলায় আবারও বেড়ে গেছে মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত লোকজনের দৌরত্ম। উপজেলার যেখানে-সেখানে হাত বাড়ালেই এখন পাওয়া যায় হিরোইন, মদ, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন রকমের মাদকদ্রব্য। বিশেষ করে উপজেলার ২ নম্বর কাশিমপুর ইউনিয়নের এক সময়ের আদর্শ গ্রাম বাহাদুরপুর গ্রামে এর পরিমাণ অনেক বেশি। পাশের পশ্চিম বালুভরা গ্রামেরও একই অবস্থা। এতে করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।
 
গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে রাস্তার দুই পাশের সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝে কাঁচা-পাকা বাড়ি। এই গ্রামটি হলো এক সময়ের আদর্শ গ্রাম বাহাদুরপুর। কিন্তু বর্তমানে গ্রামের একটু ভেতরে প্রবেশ করতেই সহজেই দেখতে পাওয়া যায় ঝোঁপ-ঝাড়ের রাস্তার পাশে পড়ে আছে ফেনসিডিলের বোতল। বাঁশ ঝাড়ের মাঝে রাতের আঁধারে বাতি জ্বেলে জুয়া খেলার দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ার মতো।
 
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা কাশিমপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামকে কয়েক বছর আগে আদর্শ গ্রাম বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই আদর্শ গ্রাম এখন মাদক সেবন, বিক্রয়, রাতে জুয়া খেলা ও চুরি ছিনতাইসহ বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। রাণীনগর থানা থেকে এই গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১কিলোমিটারের মতো হলেও এসব অবৈধ কার্যক্রম চলছে অবাধেই।
 
দিন কে দিন এসব অপকর্ম বাড়তে থাকায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে গ্রামবাসী। কখন যে কার বাড়ি, দোকান কিংবা পুকুর চুরি হয় সেই আতঙ্ক নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে সবাইকে। শুধু আদর্শ গ্রাম নয়,  মাদকসেবী ও বিক্রেতাসহ চোরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশেপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও।
 
শান্তির সেই আদর্শ গ্রাম এখন দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই গ্রাম থেকেই শিশু অপহরণকারীর একটি কুখ্যাত দলকে আটক করে পুলিশ। এই গ্রাম থেকেই এলাকার যাবতীয় অপকর্মের নীল নকশা করা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। গ্রামের এহেন অবস্থায় মনের অজান্তেই অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে অনেক উড়তি বয়সের যুবকরা।
 
বাহাদুরপুর গ্রামের মৃত-মুনছুর আলীর ছেলে জালাল সরদার জানান, মাস খানিক আগে তার পুকুরের প্রায় লাখ টাকার মাছ চুরি করেছে দুর্বৃত্তরা। পুকুরটি খাস হওয়ায় পূর্বপরিকল্পিত ভাবেই দুর্বৃত্তরা এই কাজটি করেছে।
 
একই গ্রামের মৃত-আফতাব উদ্দিনের ছেলে খন্দকার ইয়াছিন আলী (অব. আর্মি) বলেন, গত ৪ মাস আগে আমার বাড়ি থেকে কয়েকটি মোবাইল ফোন, ভিডিও ক্যামেরা ও নগদ প্রায় ৮৫ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এই বিষয়ে থানা পুলিশ সচারচর কোন অভিযোগ নিতে চায় না। আবার অনেক অনুরোধ করে অভিযোগ দিয়ে আসলেও পরবর্তীতে কোন কাজ হয় না। গ্রামে যারা এই সব কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে আসছে তারা সব সময় বহাল তবিয়তেই বসবাস করে আসছে এবং দিনের পর দিন এই সব অপকর্ম করে আসছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। 
 
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোখলেছুর রহমান বাবু বলেন, আমার কাছে এইসব বিষয়ে কোন অভিযোগ নেই। আর যে সব অভিযোগ পাই তা সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করার চেষ্টা করি। তবে এই সব অনৈতিক কর্মকাণ্ড বিষয়ে আমার কাছে লিখিত অভিযোগ এলে তা শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করবো।
 
এ ব্যাপারে রাণীনগর থানার ওসি এ.এস.এম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি এই থানায় কিছুদিন হলো যোগদান করেছি তাই আমি এসব ব্যাপারে তেমন ভালো কিছু জানি না। আমরা মাদক নির্মূলে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছি। তবে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।
 
ইত্তেফাক/জামান