চলমান শৈত্যপ্রবাহ আর ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বীজতলার চারা গাছগুলো লালচে আর হলুদ হয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা সময়মতো বোরো আবাদ করতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন- চলমান শৈত্যপ্রবাহ আর ঘন কুয়াশার কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো না পাওয়ায় বীজতলার চারা গাছগুলো 'কোল্ড ইনজুরি'তে আক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর, বর্ষাইল ও কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, মাঠে তৈরি অধিকাংশ বীজতলার চারাগাছগুলো হলুদ ও লালচে রঙ ধারণ করছে। অনেক চারাগাছ মরে গিয়ে শুকনো খড়ে পরিণত হয়ে পড়েছে। শুধু বীজতলা নয়, প্রচণ্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে আলু, সিম, সরিষাসহ অন্যান্য রবি শস্য খেতের গাছগুলো লালচে হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আলু গাছ শীতজনিত লেড ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ায় চলতি আলুর আবাদে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে জেলায় বোরো বীজতলাসহ রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বক্তারপুর ইউনিয়নের বরুনকান্দি গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, বাচ্চুসহ আরো অনেক কৃষক জানান, ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে বীজতলায় বীজ ফেলা হয়েছে। ২০-২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বীজতলার চারাগাছগুলো ভালোই ছিল। কিন্তু হঠাৎ গত ১৫-২০দিন ধরে চলা তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে সে সব বীজতলার অধিকাংশই চারাগাছগুলো এখন নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো বীজতলার সব চারাগাছই নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু বীজতলাই নয় আলু, সিম, সরিষাসহ অন্যান্য রবি শস্যের খেতও প্রচণ্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
বর্ষাইল ইউনিয়নের পাথরঘাটা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, 'এ বছর ছয় বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছি। প্রচণ্ড শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে খেতের গাছগুলো লালচে হয়ে মরে যেতে বসেছে। এ অবস্থা আরও কয়েকদিন চললে খেতের সব গাছ মরে যাবে। এতে আলুর ফলনে বড় ধরণের বিপর্যয় হয়ে বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছি।'
বক্তারপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, 'তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে এবং সূর্যের আলো কম থাকায় বীজতলার চারাগাছগুলো খাদ্য সরবরাহ না হওয়ার কারণে প্রথমে হলুদ এবং পরে লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা কৃষকদের বীজতলাগুলো সাদা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া এবং বীজতলায় রাতে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে রেখে সকালে সেই পানি বদলে আবার নতুন পানি রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ছত্রাকনাশক থিয়োভিট পাউডার ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।'
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, 'এখনও বীজতলায় বড় ধরণের তেমন ক্ষতির আশঙ্কা করছি না। আবহাওয়া কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে গেল যে সব বীজতলার চারাগাছগুলো হলুদ ও লালচে হয়ে গেছে সেগুলো আবারও ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু চলমান শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে বীজতলার চারাগাছ নষ্ট হয়ে কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। তবে আমাদের মাঠকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে থেকে বীজতলাসহ আক্রান্ত রবি শস্য নিবির পর্যবেক্ষণ ও কৃষকদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করছে।'
IMG0
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪৯ হেক্টর জমি। এ লক্ষ্যে কৃষকেরা ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেছেন। আলুর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও আলু চাষ হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। সরিষা আবাদে জেলায় ৩৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অর্জিত হয়েছে ২৭ হাজার ৪২০ হেক্টর। ভুট্টা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ২৫০ হেক্টর। অর্জিত হয়েছে ৪ হাজার ৫৭০ হেক্টর। গমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৯ হাজার ১০০ হেক্টর। অর্জিত হয়েছে ২৮ হাজার ১৩০ হেক্টর।
ইত্তেফাক/এসএস
