বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সংস্কারের পরামর্শ

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:১০
 
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি সংস্কারসহ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতির তাগিদ দিয়েছেন উন্নয়ন সহযোগিরা। সেইসাথে প্রবৃদ্ধি ও গুণগত মানের কর্মসংস্থান তৈরীতে শিক্ষার মান উন্নয়নসহ বাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা। গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠকের প্রথম দিনে বিভিন্ন অধিবেশনে এসব মতামত তুলে ধরেন তারা।
 
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং এসডিজি বাস্তবায়ন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে এক অধিবেশন সঞ্চালনা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সিপো, ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝ্যাং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসজে তারনিকসহ অন্যরা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম। চিমিয়াও ফান তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে, দারিদ্র্য হার কমেছে। কিন্তু এসময়ে অসমতা বেড়েছে। কর্মসংস্থানও আশানুরূপ নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থানে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিতেও সংস্কার আনা জরুরি। পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেটিও কঠোর নজরদারিতে আনতে হবে।
 
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিংবা জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপিকেও কার্যকর করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
 
জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপোও তার বক্তব্যে বাংলাদেশে ধনী দরিদ্রের মধ্যে অসমতা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার বোনাসকাল ভোগ করছে। এই সুযোগ একবারই আসে। বাংলাদেশকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েনচাই ঝ্যাং বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চাইলে আঞ্চলিক যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। নতুন নতুন প্রযুক্তির দিকে হাঁটতে হবে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের চিত্র ভালো নয়। আর বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতির সংস্কারের পরামর্শ তার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসজে তারনিক বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা। রপ্তানি বাজারে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে হবে না। পণ্যের নতুনত্ব আনতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
 
ফজলে হাসান আবেদ তার বক্তব্যে বলেন, দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান এখনো অনেক পিছিয়ে। ক্লাসরুম, শিক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
 
সভাপতির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে ধনী ও দরিদ্র্যের মধ্যে অসমতা প্রকট, এটা সিরিয়াস সমস্যা। শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিতের বিষয়ে আবেদ সাহেব যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তার সঙ্গে আমিও একমত। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা, জনসংখ্যার বোনাসকালকে কাজে লাগানো, অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রবদ্ধির জন্য সরকার গত নয় বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
 
গতকাল প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ শীর্ষক অপর এক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ তারেক, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) সিনিয়র ইকোনমিষ্ট ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং এমসিসিআই এর সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির।
 
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অব্যাহত রয়েছে। এফডিআই বাড়ছে। তবে এক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ কম। আগের বিনিয়োগকারীরাই পুণ:বিনিয়োগ করছে। তারমতে, বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো এবং রপ্তানি বাড়ানো। নিহাদ কবির বলেন, বিভিন্ন সংস্থা থেকে তথ্য আসছে বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবতা কী। দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথা বলা হলেও মাত্র ৪ থেকে ৫টিতে কাজ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগের জন্য সবার আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংস্কার করতে হবে। শহিদুল হক বলেন, আমরা পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাস করছি। এক্ষেত্রে বাস্তবতা হল বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং ভু-রাজনৈতিক পরিবর্তন বিনিয়োগে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন জরুরি।
 
ইত্তেফাক/কেকে