কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে উদাসীন

রামেক হাসপাতালে নিয়ম না মেনেই রিপ্রেজেন্টেটিভদের চিকিৎসক ভিজিট

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০১
 
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে নিয়মনীতির তোয়াক্কা ছাড়াই চিকিৎসক ভিজিট করছেন বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ব্যাপক ভোগান্তিসহ চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়ন্ত্রণে উদাসীন।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির দেড় শতাধিকের বেশি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজ করেন। এরমধ্যে বেক্সিমকো, স্কয়ার, এ্যারিস্টোফার্মা, অপসোনিন, অরিয়ন, ইনসেপটা, হেলথ কেয়ার, এসকে এফ, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, একমি ও বিভিন্ন পট কোম্পানিসহ হারবাল কোম্পানির প্রতিনিধিগণ চিকিৎসক ভিজিট করেন। তারা প্রতিদিন হাসপাতালে চিকিৎসকদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং নিজ নিজ কোম্পানির ওষুধ লেখার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে চিকিৎসকরা দামী উপঢৌকন পান ওষুধ কোম্পানির পক্ষ থেকে। 
ডাক্তার ভিজিটের জন্য রিপ্রেজেন্টেটিভদের সপ্তাহে দুইদিন সোমবার ও বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নিয়ম করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রিপ্রেজেন্টিটিভরা ওই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না। তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে থেকে রাত পর্যন্ত ডাক্তার ভিজিট করেন। এরমধ্যে সকাল থেকে আউটডোর বন্ধের আগ পর্যন্ত এবং ইনডোরে সকাল দুপুর ও রাত তিন বেলাই ডাক্তার ভিজিট করেন। এতে হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
 
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় হাসপাতাল আউটডোরের বিভিন্ন চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, রিপ্রেজেন্টিটিভরা ভিড় জমিয়েছেন এবং আউটডোরের মূল গেটে ৩০/৩৫ জন রোগীদের নিকট থেকে ব্যবস্থাপত্র দেখছেন। কেউ দেখাতে না চাইলে তারা টেনে হিঁচড়ে ব্যবস্থাপত্রগুলো দেখছেন।
 
এছাড়াও বহির্বিভাগের রেডিয়েশন অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসকের চেম্বারে তিনজন রিপ্রেজেন্টিটিভকে বসে থাকতে দেখা যায়। এর কিছুক্ষণ পরে সেখানে আরো তিনজন অবস্থান নেন। ওই সময় চিকিৎসক রোগী দেখা বাদ দিয়ে রিপ্রেজেন্টিটিভদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন।
 
নাম না প্রকাশ করার শর্তে রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগের একজন জানান, বহির্বিভাগের আবাসিক সার্জনসহ চিকিৎসকরা জানেন যে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে রিপ্রেজেন্টিটিভদের সময় দেয়া যাবে না। কিন্তু চিকিৎসকরাও বিষয়টি এড়িয়ে রিপ্রেজেন্টিটিভদের সময় দিয়ে থাকেন। রিপ্রেজেন্টিটিভদের দেয়া পরামর্শ মতো ওষুধ লেখলেই তাদের হাতে পৌঁছে যায় নানা রকমের উপহার সামগ্রী। এরমধ্যে কলম, প্যাড, ওষুধ এবং বড় সার্জনের জন্য বড় ধরনের উপঢৌকন পৌঁছে যায় কোম্পানির পক্ষ থেকে। যার ফলে তারা তাদের দেয়া পরামর্শ মতো ওষুধ লিখে থাকেন বলে জানা যায়। চিকিৎসকদের ওষুধের ব্যবস্থাপত্রে মাঝে-মধ্যে এমনও ওষুধ লিখতে দেখা যায় যে যেগুলো বাজারে খুঁজে পাওয়া যায় না।
 
অন্যদিকে হাসপাতালের ইনডোরের বিভিন্ন ওয়ার্ডেও রিপ্রেজেন্টিটভরা একইভাবে চিকিৎসক ভিজিট করেন। তারা নির্ধারিত দিনের বাইরে ওয়ার্ডে গিয়ে চিকিৎসকদের সাথে সাক্ষাত করেন। জরুরি রোগী আসলেও তারা রিপ্রেজেন্টিটিভরা চিকিৎসকের সাথে গল্প করেন। গত কয়েকদিন আগে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একরোগী অভিযোগে বলেন, হঠাৎ করে আমার রোগীর অবস্থা খারাপ হলে আমি কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে দৌড়ে যাই। সেখানে গিয়ে সমস্যার কথা জানালে ডাক্তার পরে আসছেন বলে জানান। এর কয়েক মিনিট পরে আবার গেলে একই কথা বলে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেন। অথচ তিনি ওই সময়ে একজন রিপ্রেজেন্টিটিভের সাথে গল্প করছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন তিনি। এভাবে রিপ্রেজেন্টিটিভদের অবাধ যাতায়াতে ব্যাপক ভোগান্তির মধ্যে পড়ে রোগীরা চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যেন উদাসীন। তবে মাঝে-মধ্যে হাসপাতালের পুলিশ ও আনসার সদস্য তাদের ধরলেও তারা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়ে যান। পরের দিন আবার একইভাবে হাসপাতালে আসেন। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতাল পুলিশ বক্সের সদস্যরা কোম্পানির প্রতিনিধিদের থেকে বিভিন্ন ওষুধ নিয়ে তাদের ভিজিট করতে দেন। একই চিত্র আনসার সদস্যদের বেলায়ও প্রযোজ্য বলে জানা যায়।
 
এ বিষয়ে বুধবার রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জামিলুর রহমানের মতামত জানতে তার কার্যালয়ে গিয়ে তিন ঘণ্টা বসেও সাক্ষাত পাওয়া যায়নি। দুপুর পৌনে ২টার দিকে পরিচালক পিএর মাধ্যমে জানান, তিনি কোনো সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাত করতে পারবেন না। পরে হাসপাতাল পরিচালকের সরকারি মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।
 
বর্তমান পরিচালক যোগদানের পর থেকেই সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন। ফলে তার ল্যান্ড ও সরকারি মোবাইলে কল দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে রামেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সদর আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার দৃষ্টি আকর্ষণ হলে তিনি বলেন, আমি মিটিং ডেকে বিষয়টি পরিচালককে বলব।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি