ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, বিশাল সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ২০০৭ সালে ৬ জন এসিডদগ্ধকে চাকরি দিয়েছিল গ্রামীণফোন। ওই সাংবাদিক সম্মেলনে গ্রামীণফোনের তত্কালীন সিইও এরিক অস ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কানাডিয়ান হাইকমিশনার বারবারা রিচার্ডসন। গ্রামীণফোনের সিইও বলেছিলেন, গ্রামীণফোন এই নারীদের পুনর্বাসনে এগিয়ে এসেছে। গ্রামীণফোন মনে করে, সমাজের সব মানুষের কাজ করার অধিকার আছে। কেউ অবহেলিত নয়। আর বারবারা রিচার্ডসন গ্রামীণফোনকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন অসহায় নারীদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য।
এই তো গেল সেই সময়ের গল্প। ১০ বছর পর সেই অসহায় নারীরা আরো বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন। কাউকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের সবার সঙ্গেই প্রতারণা করেছে গ্রামীণফোন। এখন কাউকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়ায় রেখে পাঠানো হয়েছে ঢাকার বাইরে। এসিডদগ্ধদের চাকরি দিয়ে সেই সময় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণাও পায় গ্রামীণফোন। এই ৬ জনের একজন মোছা. মনসুরা। যাকে চাকরি দেয়ার চার বছর পর কোনো নোটিস ছাড়াই বাদ দেয়া হয়েছে। কেন বাদ দেয়া হলো, তার সুযোগ-সুবিধারই কি হবে? এসব কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেয় না প্রতিষ্ঠানটি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মনসুরা এখন থাকেন ঠাকুগাঁওয়ের পীরগঞ্জে শিরাইল গ্রামে বাবার বাড়ি।
নিজের বিরুদ্ধে গ্রামীণফোনের এই প্রতারণার বিচার চান মনসুরা। ঠাকুরগাঁও থেকে এসেছেন ইত্তেফাকে। জানালেন ক্ষোভের কথা, অভিমানের কথা। কিভাবে গ্রামীণফোন তাদের নিয়ে ব্যবসা করেছে, প্রচারণা পেয়েছে, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। ইত্তেফাকের সম্পাদকের কাছে লিখিত আবেদনে মনসুরা বলেন, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোনের প্রশাসনিক বিভাগে উচ্চ অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। তাকে আইডি কার্ড আর মোবাইল নম্বর দেয়া হলেও নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি। বারবার তারা চাইলেও সেটা পাননি। তবুও মেয়েকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন মনসুরা। জীবনও চলতে থাকে স্বাভাবিক গতিতে।
২০১১ সালে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাত্ একদিন তাকে বলা হয় মোবাইল ফোনটি জমা দিতে। কেড়ে নেয়া হয় আইডি কার্ড। কি কারণে তাকে বাদ দেয়া হচ্ছে- জানতে চেয়েছিলেন তিনি। জবাব পাননি। দু’একজন সহকর্মী বলেছেন, ওই বিভাগটি বিলুপ্ত করেছে গ্রামীণফোন। এ কারণে অন্যদের সঙ্গে তারও চাকরি চলে যায়। একটা প্রশ্ন নিয়ে গ্রামীণফোনের ঊর্ধ্বতনদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি- প্রশ্নটা ছিল আমাকে তো পুনর্বাসন করা হয়েছে। তাহলে আমার কেন চাকরি যাবে। কাজ না পারলে বাদ দিত, সে কথাও তো তারা বলছে না। আমি তো আমার কাজ যথাযথভাবেই করে যাচ্ছি। তাহলে বিনা কারণে পুনর্বাসন করা একজনকে কিভাবে বাদ দিতে পারে?
মনসুরার শুধু চাকরি খেয়েই শান্ত হয়নি গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। চার বছরের বেশি সময় চাকরি করেও একটি পয়সা তাকে দেয়নি গ্রামীণফোন। কোন ধরনের সুযোগ সুবিধাও দেয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসিডদগ্ধ এই নারী। তিনি চাকরি ফিরে চান, নিজে কিছু করে জীবন অতিবাহিত করতে চান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেলে, এই ৬ জনের সবার সঙ্গেই একইভাবে প্রতারণা করেছে গ্রামীণফোন। একজন তো রাগে-ক্ষোভে দেশ ছেড়েছেন। আরেকজন লুলু মনসুরা। তাকে চাকরিচ্যুত করতে ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে বরিশাল। রেজাউলকেও বাদ দেয়া হয়েছিল। আদালতে মামলা করে কোনোভাবে চাকরিটা টিকিয়ে রেখেছেন এই এসিডদগ্ধ পুরুষ। একজনকে পাঠানো হয়েছে রাজশাহী। একজন প্রধান কার্যালয়ে টিকে আছে কোনোভাবে। এই হল- সেই ৬ এসিডদগ্ধের গল্প। সেই সময় বাংলাদেশের সবগুলো মিডিয়া, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলোতে ব্যাপক প্রশংসিত হয় গ্রামীণফোনের এই উদ্যোগ। টক শোতেও সবাই গ্রামীণফোনকে ধন্যবাদ দেন। অথচ পরের গল্পটা যে প্রতারণার সেটা অনেকেরই জানা নেই। এই ৬ জনই এখন বেঁচে থাকতে সংগ্রাম করছেন প্রতিদিন।
জানা গেছে, গ্রামীণফোনে এই নারীদের চাকরির ব্যবস্থা করেছিল এসিড সারভাইভাস ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী নিহারিকা মমতাজ গ্রামীণফোনে এই নারীদের চাকরি দিয়ে বেশ কৃতিত্ব নিয়েছিলেন। অথচ চাকরি যাওয়ার পর এই মানুষগুলো এসিড সারভাইভাস ফাউন্ডেশনে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। তাদের পক্ষে কেউ গ্রামীণফোনে কথা বলেননি বলে জানিয়েছেন মনসুরা। চাকরি দেয়ার ওই সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাবের তত্কালীন সভাপতি শওকত মামমুদ, নরওয়ে দূতাবাসের প্রথম সচিব আনে হাপ এবং গ্রামীণফোনের নতুন ব্যবসায়িক শাখার পরিচালক কফিল এইচ এস মুঈদ। এসিডদগ্ধ মনসুরা চাকরি যাওয়ার পর সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। ফিরে পাননি চাকরি।
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য-
গত সোমবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘গ্রামীণফোনের কর্মচারীরা মামলা চালাতেই নিঃস্ব’ শীর্ষক সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে গ্রামীণফোন। চাকরিচ্যুত কর্মীদের গ্রামীণফোন আউটসোর্সিং ভেন্ডরের কর্মী বলে দাবি করেছে। এ বিষয়টিও আদালতে বিচারাধীন। এই কর্মীরা তাদের নিজ ভেন্ডর কোম্পানির দেয়া প্যাকেজ অফার গ্রহণ করে স্বেচ্ছায় চলে গেছেন।
প্রতিবেদকের বক্তব্য :এরা কেউই ভেন্ডরের কর্মী হিসেবে গ্রামীণফোনে যোগ দেননি। তারা সবাই গ্রামীণফোনের কর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন। পরে তাদের ভেন্ডরের কাছে পাঠানো হয়। এসব বিষয় নিয়েই মামলা চলছে। দীর্ঘ ২০ বছরও কোনো কোনো কর্মী চাকরি করছেন। অথচ গ্রামীণফোন তাদের আদালতের দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তাদের শ্রমেই আজ গ্রামীণফোন এই পর্যায়ে। অথচ তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, ঠকিয়ে এখন আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ইত্তেফাক/আনিসুর
