ভারতীয় ক্রিকেট মহলে একটা সময় জোর আলোড়ন তৈরি হয়েছিল ভারতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে সাবেক কোচ ক্রেগ চ্যাপেলের বিবাদ ঘিরে। দুজনের তিক্ত সম্পর্কের ওই অধ্যায়ের প্রায় এক দশক পরে আরও কিছু ঘটনার কথা খোলাখুলি জানিয়েছেন সৌরভ। চ্যাপেল জমানায় তাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য গুরু গ্রেগের কৌশলের কথা সৌরভ ‘ইলেভেন গডস অ্যান্ড আ বিলিয়ন ইন্ডিয়ান্স’ গ্রন্থে জানিয়েছেন সৌরভ। বোরিয়া মজুমদারের লেখা ওই গ্রন্থে ভারতে ও ভারতের বাইরে মাঠ ও মাঠের বাইরের ঘটনা অকপটভাবে জানিয়েছেন সৌরভ। গ্রন্থটি আইপিএলের সময় প্রকাশিত হবে।
সৌরভ জানিয়েছেন, ২০০৫-এর সেপ্টেম্বরে বুলাওয়েতে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম টেস্টে আগে এক দিন সন্ধ্যায় তার কাছে আসেন চ্যাপেল। টেস্ট ম্যাচের জন্য খেলোয়াড়দের একটা তালিকা অধিনায়কের হাতে তুলে দেন কোচ। গ্রেগের তালিকায় প্রথম একাদশে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের নাম ছিল না। তালিকা দেখে কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সৌরভ। বুঝতে পারছিলেন না, গ্রেগ চাইছেন টা কী।
২০০৫-এর জুলাইতে গ্রেগ যখন ভারতীয় দলের কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন সৌরভ দলে ছিলেন না। কারণ, তার আগে মে মাসে স্লো ওভার রেটের জন্য ছয় ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছিল সৌরভকে। তার জায়গায় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। সেপ্টেম্বরে জিম্বাবুয়ে সফরের সময় ফের অধিনায়ক হিসেবেই দলে ফিরে আসেন সৌরভ।
তিনি জানিয়েছেন, ওই সফরের শুরু থেকেই সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল না। আমি জানতাম না, ঠিক কী হয়েছে। কিন্তু একটা গোলমাল রয়েছে।

সৌরভ বলেছেন, আমার মনে হয়, ওই সময়ের আগে যারা গ্রেগের ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিল তারা তাকে বলেছিল যে, আমি থাকলে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকা করতে পারবেন না। এইজন্যই হয়ত গ্রেগের আচরণে বদল ঘটেছিল। সব কিছু দেখে সৌরভ জিম্বাবুয়ের সফরের গ্রেগের সঙ্গে ২০০৩-এ যে তাকে অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য সাহায্য করেছিলেন, সেই গ্রেগের কোনও মিল নেই। তাই প্রথম একাদশ নিয়ে গ্রেগের প্রস্তাব তিনি তত্ক্ষণাত নাকচ করে দিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে সৌরভ বলেছেন, আমি তাঁর প্রস্তাব খারিজ করে জানিয়ে দিই যে, যাদের তিনি বাদ দিতে চাইছেন, ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য তারা অনেক কিছু করেছেন। বলি, মাত্র তিন মাস হল এসেছেন। তাই পরিস্থিতি বুঝতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। কিন্তু আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, দলকে গ্রেগ চ্যাপেলের দলে পরিণত করার জন্য খুব তাড়া ছিল তার।
জিম্বাবুয়ে সফরের শুরুতে প্রস্তুতি ম্যাচের সময় গ্রেগের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের কথাও সৌরভ জানিয়েছেন। ওই ম্যাচে টেনিস এলবো-র জন্য রিটায়ার হার্ট হল সৌরভ। গ্রেগ সেই সময় ড্রেসিংরুমে ছিলেন না। কিন্তু সৌরভ রিটায়ার হার্ট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার কিছুক্ষণ পরেই চলে আসেন গ্রেগ এবং জানতে চান, কী হয়েছে। সৌরভ তাকে বলেন, কনুইয়ে ব্যাথা করছে। সামনেই টেস্ট। তাই ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি।
কিন্তু একথা শোনার পর গ্রেগ যা বললেন, তাতে কার্যত চমকে উঠলেন সৌরভ। গ্রেগ সৌরভকে ফের ব্যাট করতে নামার জন্য জোর করতে শুরু করেন। সৌরভ জানিয়েছেন, এ কথা শুনে তিনি বলতে বাধ্য হলেন যে, তিনি আর ব্যাট করবেন না। কারণ এখানে খেলে টেস্টে খেলার সুযোগ বানচাল করতে তার আদৌ কোনও আগ্রহ নেই।
জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে টেস্টে সেঞ্চুরি করেন সৌরভ। ছয় ঘন্টা ব্যাটিং করে ফিরে সৌরভ কনুইতে বরফ দিচ্ছিলেন। গ্রেগ এসে জানতে চান, ব্যাথা রয়েছে কিনা। সৌরভ তাকে বলেন, এই মাত্র তো সেঞ্চুরি করে এলাম। তাই ব্যাথার বিষয়টিকে আর গুরুত্ব দিয়ে লাভটা কী। ব্যাথা থাক বা না থাক দলের হয়ে নিজের কাজটা ঠিক করতে পেরেছি।
সৌরভ আরও জানিয়েছেন, একদিন তো গ্রেগ চিত্কার চেঁচামেচি পর্যন্ত শুরু করেন।

সৌরভ এরপর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে একদিনের সিরিজে কনুইয়ের চোটের জন্য দল থেকে বাদ পড়ার প্রসঙ্গটিও উল্লেখ করেছেন। সৌরভ জানিয়েছেন, তিনি গ্রেগের কাছে জানতে চান, তাকে বাদ দেওয়া হল কেন। তখন গ্রেগ বলেন, প্রথমে ফিটনেসের প্রমাণ দিতে হবে, তাহলেই দলে ফিরতে পারব। গ্রেগ আরও বলেন, চ্যালেঞ্জার ট্রফিতে আমি খেলিনি। তাই আমি পুরো ফিট কিনা, সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
সৌরভ জানিয়েছেন, গ্রেগের এই কথায় তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন। কারণ, চ্যালেঞ্জার ট্রফিকে কখনোই সিলেকশন ট্রায়াল হিসেবে ধরা হয় না। আমি গত কয়েক বছরে দলে অন্য যে কারোর তুলনায় বেশি রান করেছিলাম। তাই দলে নিজের নাম না দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। সেই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম, গ্রেগ আমার ক্যারিয়ারটা খতম করতে চাইছেন।
ইত্তেফাক/ রেজা
