বগুড়ায় প্রয়াত সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তী হত্যা মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিল করেছে পুলিশ। তবে অভিযুক্ত অপর তিন জেএমবি নেতার মৃত্যুদণ্ড ও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ায় অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় এই মামলা থেকে আওয়ামী লীগ নেতাসহ সাতজনকে অব্যহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বগুড়া আদালতের পরিদর্শক শাজাহান আলী জানান, ২৫ জানুয়ারি বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও শেরপুর উপজেলার আমলী আদালতের বিচারক আবু রায়হানের আদালতে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মজিবর রহমান। রবিবার (২৮ জানুয়ারি) অভিযোগপত্রটি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। মামলার নির্ধারিত দিনে তার ওপর শুনানি গ্রহণ করা হবে।
এদিকে মামলার বাদী দীপংকর চক্রবর্তীর ছেলে পার্থ সারথী চক্রবর্তীসহ পুরো পরিবার পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
অভিযোগপত্রে আসামিরা হলেন, রাজধানী হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জেএমবির শীর্ষনেতা ও গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার রাঘরপুর (ভুতমারাঘাট) গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, সাতক্ষীরা আদালতে বোমা হামলায় বিচারক হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জেএমবির শুরা সদস্য সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই ও জেএমবির অপারেশনাল কমান্ডার ও শায়খ আব্দুর রহমানের জামাতা আব্দুল আওয়াল এবং ২০১৫ সালের ২০ জুলাই গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত জেএমবি নেতা ফজলে রাব্বী ওরফে সাজেদুর ইসলাম। এই মামলায় আরও সাতজন অব্যহতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে তদন্তে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা না থাকায় এই মামলায় এরআগে সন্দিগ্ধ আসামি হিসাবে গ্রেফতার হওয়া (বর্তমানে জামিনে রয়েছেন) ৭ জনকে মামলার দায় হতে অব্যহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরা হচ্ছেন ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়া শেরপুরের জয়নগর গ্রামের জেএমবি সদস্য সাইদুল ইসলাম, ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর
গ্রেফতার চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বালুগ্রামের জেএমবি সদস্য বকুল ওরফে জাবেদ, বগুড়া জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাবেক নেতা স্বপন কুমার সিংহ, ষষ্ঠি ঠাকুর, বগুড়া জেলা যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সাগর কুমার রায়, মেহের উদ্দিন খান এবং শফিউ ররহমান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বগুড়া জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মজিবর রহমান বলেন, থানা, ডিবি ও সিআইডি পুলিশের ১২জন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তিন দফায়। সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তী হত্যা মামলায় বাদী পার্থ সারথী চক্রবর্তীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর বগুড়ার জ্যেষ্ঠ বিচারিক মামলাটি পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) কে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিলে মামলাটির তদন্ত দায়িত্ব পাই। তদন্তের একপর্যায়ে অন্য মামলায় গ্রেফতার জেএমবির শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতের কথা স্বীকার করেন। ফলে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডটির রহস্য উন্মোচিত হয়। গত বছরের ৬ মার্চ বগুড়ার শেরপুর উপজেলার আমলি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন জেএমবি নেতা জাহাঙ্গীর আলম। সেখানে তিনি দীপংকর চক্রবর্তী হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাতে তিনি বলেন, জেএমবি সম্পর্কে লেখালেখির কারণে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জেএমবির শুরা সদস্য সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের জামাতা আব্দুল আওয়ালের নির্দেশে দীপংকর চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোপত্র দাখিল করা হয়েছে।
এদিকে সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তীর পরিবারের অভিযোগ, এই হত্যাকান্ড তদন্তে শুরু থেকেই পুলিশের ভুমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। মামলার বাদী পার্থ সারথী চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতেই নাটক সাজিয়েছে। মামলা শেষ করতে যেনতেনভাবে তদন্ত করে জঙ্গিদের ওপর দোষ চাপিয়ে আদালতে চার্জশীট দেওয়া হয়েছে। পুলিশ না পেরে এখন জঙ্গিদের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এটা জঙ্গি হামলা হতেই পারে না। পুরোপুরিই অবিশ্বাস্য। কারণ জঙ্গিরা বাবার ওপর হামলা করলে আগে থেকে হুমকি দিত না। কিন্ত হত্যার কয়েকদিন আগে থেকেই বাবাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ, দীপংকর চক্রবর্তী বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি ও বগুড়ার স্থানীয় দৈনিক দুর্জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার বগুড়ার শেরপুর উপজেলার স্যানালপাড়ায় নিজ বাড়ির কাছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের পরদিন ৩ অক্টোবর তাঁর বড় ছেলে পার্থ সারথী চক্রবর্তী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে শেরপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ইত্তেফাক/এমআই
