শ্রীমঙ্গলে বয়স্ক ভাতা থেকে বঞ্চিত আদিবাসীরা

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:২০
 
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা, পাহাড়ি জনপদে গড়ে ওঠা আদিবাসী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই এখনো বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের ২ নম্বর নিহার পুঞ্জির বাসিন্দা আদিবাসী নিহার পুঞ্জিতে স্পল তাদের মধ্যে একজন। ৭৯ বছর পেরিয়ে ৮০ ঘরে পা রেখেছেন তিনি। মৃত্যুর দোয়ারে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছেন এই অদিবাসী। ঘরে ২৫ বছর বয়সী অসুস্থ এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে স্পলের শেষ বয়সের সংগ্রাম যেন জুম চাষেই সীমাবদ্ধ। পাহাড়ের বুকে পান চাষ করে জীবনের শেষ সময়ে এসে এখনো সংসারের ঘানি টানছেন তিনি। অথচ আজ পর্যন্ত বয়স্ক ভাতার কার্ড জোটেনি তার কপালে। স্পলের মতো এমবুন সুঙ (৭০), কিরণ তংপেয়ার ৭০) ও কিন তংপেয়ার (৭০) সহ আরো অনেকেই বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
 
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৬৫ বছরের পর কোন পুরুষ এবং ৬২ বছরের পর কোন মহিলা যদি সরকারি কর্মচারী পেনশনভোগী না হন, দুঃস্থ নারী হিসেবে ভিজিডি কার্ডধারী না হন অথবা অন্য কোনোভাবে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা/সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হতে নিয়মিতভাবে আর্থিক অনুদান/ভাতাপ্রাপ্ত না হন এবং ওই হতদরিদ্র পুরুষ বা নারী যার বার্ষিক গড় আয় অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা, শারীরিকভাবে অক্ষম, কর্মক্ষমতাহীন, প্রবীণ পুরুষ ও নারী, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত, বিপত্নীক, নিঃসন্তান, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবীণ পুরুষ ও নারী অথবা যে প্রবীণের আয়কৃত সম্পূর্ণ অর্থ তার পরিবারের খাদ্য বাবদ ব্যয় করার পর স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার কোন অর্থ অবশিষ্ট থাকে না এবং ভূমিহীন বয়স্ক ব্যক্তির সকলেই বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও স্পল'রা এখনো ধুকে ধুকে চলছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী স্পল বয়স্কভাতা পাওয়ার আওতায় আসলেও বিগত ১৫ বছর ধরে তার ভাগ্যে জোটেনি বয়স্কভাতা। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা আর নজরদারীর অভাবে এদের অধিকাংশই ভাতা বঞ্চিত জীবন-যাপন করছেন। দারিদ্র আর অপুষ্টিহীনতায় ভুগতে ভুগতে ক্রমেই নিঃশেষ হচ্ছে এদের জীবন।
 
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সুয়েব হোসেন চৌধুরী বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা মিলিয়ে এখানে সর্বমোট বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ৭ হাজার ২৩৮ জন। তাছাড়া প্রতি অর্থ বছরেই বয়স্ক ভাতার জন্য নতুন বরাদ্দ আসে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানকে সভাপতি ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীকে সদস্য সচিব করে সকল ইউপি সদস্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে যাচাই বাছাই করে উপকারভোগীদের নতুন তালিকা তৈরি করেন এবং এই তালিকা অনুযায়ী বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয়। তবে প্রতিবছরই প্রত্যেক ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ৩০ থেকে ৪০ জন করে তালিকায় নাম যোগ হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ব্যাপারে প্রকৃত বয়ষ্কভাতা বঞ্চিতদের তথ্য সংগ্রহে আরও যাচাই বাছাই করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।
 
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম বলেন, আমরা সরকারি বরাদ্দের বাইরে যেতে পারি না। সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী আমরা ভাতাভোগীদের মাঝে সকল ভাতা সমবণ্টন করার চেষ্টা করি। এতে অনেকেই বাদ পড়তে পারেন। তবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে বয়োজ্যেষ্ঠদের নাম সংগ্রহ করা হয়। তিনি আরো বলেন, 'বয়স্ক ভাতা বঞ্চিতরা সরকারের অন্যান্য খাতে যেমন বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, আদিবাসী ভাতা, পঙ্গু ভাতাসহ বিভিন্ন খাতের আওতায় চলে আসতেছেন। এতে করে তারা কোন না কোন দিকে সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছেন।'
 
শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রেমসাগর হাজরা বলেন, 'সরকারি এসব কাজে আমাদের কোন সম্পৃক্ততা থাকে না।' তবে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও চা-শ্রমিকসহ অসংখ্য লোকেরাই বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
 
ইত্তেফাক/এসএস