ভয়াবহ আর্সেনিকের কবলে চৌগাছা

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৮, ১৫:৩৯
 
যশোরের চৌগাছায় আর্সেনিক সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ২৪ জন মারা গেছেন। উপজেলার ১শ' ৬০টি গ্রামে বর্তমান আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭শ' ৬১ জন।
 
সরকারি-বেসরকারি এবং বিভিন্ন এনজিও আর্সেনিক নিয়ে গবেষণা করলেও তেমন কোন প্রতিকারের পথ বের করতে পারেনি বলে জানিয়েছে চৌগাছা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে চৌগাছা উপজেলাকে আর্সেনিক মুক্ত পানি পান করার জন্য সরকারিভাবে ১১টি ইউনিয়নে হাজার হাজার টাকা ব্যয়ে ১০শ' ৫টি গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও তাতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ধরা পড়ায় এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৫শ' ২৫টি বিভিন্ন অগভীর নলকূপ স্থাপন করলেও তা পুরোপুরি আর্সেনিক মুক্ত নয় বলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে জানিয়েছেন। বর্তমান বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপজেলায় আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
আর্সেনিকের ভয়াবহতার ফলে অত্র এলাকায় দেখা দিয়েছে সামাজিক সমস্যা। বাইরের এলাকার লোক এ এলাকায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে অনীহা প্রকাশ করছে। নিরাপদ পানির অভাবে আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ছে। নীরব ঘাতক আর্সেনিকের কারণে এ এলাকার জনশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। শারীরিক কাঠামোতে ও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
 
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চৌগাছা এবং শার্শা উপজেলায় বাংলাদেশের মধ্যে অধিকাংশ নলকূপে মাত্রাতিরক্তি আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সূত্র জানায়- চৌগাছা উপজেলায় ৩৬ হাজার ৭শ' ৫৪টি নলকূপের মধ্যে ৪৮ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাশাপোল ইউনিয়নে ২ হাজার ৮শ' নলকূপের মধ্যে ৪৭%  নলকূপে, আর্সেনিক যুক্ত। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২শ' ৪৫ জন। হাকিমপুর ইউনিয়নে ৩ হাজার ৪শ'টি নলকূপের মধ্যে ৩৮% নলকূপ আর্সেনিক যুক্ত। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১শ' ৩০ জন। ধুলিয়ানী ইউনিয়নে ২ হাজার ৩শ' ২০ টি মধ্যে নলকূপের মধ্যে ৪৫% আর্সেনিক যুক্ত। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩শ' ১০ জন। জগদীশপুর ইউনিয়নে ২ হাজার ৮শ' ৬টি নলকূপ মধ্যে ৫৫% আর্সেনিক যুক্ত। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯শ' ৩৯ জন। সিংহঝুলী ইউনিয়নে ২ হাজার নলকূপের মধ্যে ৫২% আর্সেনিক যুক্ত। রোগীর সংখ্যা ১শ' ৭০ জন। পাতিবিলা ইউনিয়নে ২হাজার ৪শ' ২০টি নলকূপের মধ্যে ৫০% আর্সেনিক যুক্ত। রোগীর সংখ্যা ৫০ জন।
 
স্বরূপদহ ইউনিয়নে ৪ হাজার ৪শ' ৫০টি নলকূপের মধ্যে ৩৫% আর্সেনিক যুক্ত। আর্সেনিক রোগীর সংখ্যা ৭০ জন। ফুলসারা ইউনিয়নে ৩ হাজার ৪শ' ৭৬টি নলকূপের মধ্যে ৫৩% আর্সেনিক যুক্ত। আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২শ' জন। নারায়নপুর ইউনিয়নে ৪ হাজার ৪শ' ৫০টি নলকূপের মধ্যে ৩৭% আর্সেনিক যুক্ত। আর্সেনিক রোগীর সংখ্যা ৬০ জন। সুখপুকুরীয়া ইউনিয়নে ৩ হাজার ৪শ' ৬০টি নলকূপের মধ্যে ৪০% আর্সেনিক যুক্ত। আর্সেনিক রোগীর সংখ্যা ১শ' ৮ জন। চৌগাছা ইউনিয়নে ১হাজার ৯শ' ৪টি নলকূপের মধ্যে ৪০% আর্সেনিক যুক্ত। আর্সেনিক রোগীর সংখ্যা ১শ' ৪৫ জন। চৌগাছা পৌরসভা এলাকায় ৩ হাজার ৫শ' ৮২ট নলকূপে মধ্যে আর্সেনিক। রোগীর সংখ্যা ৩শ' ৩৪ জন।
 
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জগদিশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া ও চৌগাছার কয়ারপাড়া, ফুলসার আড়াৎদাহ ও ধুলিয়ানীর কুষ্টিয়া, আজমতপুর গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে ভয়াবহ। আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২৪জন। এর মধ্যে মাড়ুয়া গ্রামেই ১৮ জন। অত্র এলাকায় আর্সেনিকের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে এক সময় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জাপানি দাতা সংস্থা জাইকা কাজ করতো। বর্তমান কোন গবেষণা নেই। নেই কোন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড। অথচ জেনে শুনে এ মরণঘাতি আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করে চলেছে চৌগাছাবাসী।
 
উল্লেখ্য, উপজেলার কুষ্টিয়া, আজমতপুর গ্রামে জাইকা কর্তৃক প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে পাশে বাঁওড় থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে আর্সেনিক মুক্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে। এখান থেকে এ দুটি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪ শ' পরিবারের মত আর্সেনিক মুক্ত খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে আর্সেনিক মিটিগেশন প্রজেক্ট চৌগাছা এর মেয়াদ ২০০৯ সালের ৩০ নভেম্বর শেষ হওয়ায় ইতিমধ্যে জাইকা তাদের গবেষণা কাজ বন্দ করে চলে গেছে। তবে সচেতন মহল বলছেন উক্ত প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ১৪ কোটি টাকা ব্যয় করলেও চৌগাছায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীদের তেমন কোন উপকারে আসেনি।
 
ইত্তেফাক/এসএস