মৌলভিত্তির কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও লোকসান

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০৯

শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা সব সময়ই মৌলভিত্তি সম্পন্ন ও মুনাফামুখী কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন। কারণ এতে লোকসানের আশঙ্কা কম থাকে। অথচ ২০১৭ সালে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কিছু কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও লোকসান গুণতে হয়েছে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদেরকে। অথচ সবচেয়ে বেশি মূলধনী মুনাফা হয়েছে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কিছু কোম্পানিতে। বিনিয়োগকারীদের অদক্ষতা ও গুজবনির্ভর বিনিয়োগের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন সম্পদ ব্যবস্থাপকরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে দেখা গেছে, সার্বিক বিবেচনায় মৌলভিত্তি সম্পন্ন ও মুনাফামুখী কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, সামিট পাওয়ার, খুলনা পাওয়ার, আরএকে সিরামিকস, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট, এনভয় টেক্সটাইল, বিএসআরএম স্টিল ও বার্জার বাংলাদেশের মতো কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকারীরা ২০১৭ সালে মূলধনী মুনাফা করতে পারেননি। এসব কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশের মাধ্যমে কিছুটা মুনাফা পেয়েছেন। অথচ ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মূলধনী মুনাফা করেছেন দীর্ঘদিনের লোকসানি কোম্পানি কে এন্ড কিউ, দুলামিয়া কটন এবং সাভার রিফেক্টরিজে বিনিয়োগকারীরা। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীরা ২৯৩ শতাংশ পর্যন্ত মূলধনী মুনাফা করতে পেরেছেন।

মৌলভিত্তির কোম্পানি বলতে সাধারণত যেসব কোম্পানি বছরে অন্তত ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা করে, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা রয়েছে, বাজার মূলধন বেশি, নির্দিষ্ট খাতে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন রয়েছে- এমন কোম্পানিকে বোঝায়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায় রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি। ২০১৭ সালে কোম্পানির বিক্রি ও নিট মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি না আসায় শেয়ার দরে তেমন প্রভাব পড়েনি। বরং যারা ২০১৭ সালের পুরো সময়টা এ শেয়ার ধরে রেখেছেন, তাদের বছর শেষে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ লোকসান গুণতে হয়েছে।

২০১৭ সালে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের শেয়ারে বিনিয়োগ করে ২৩ শতাংশ মূলধন হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানির শেয়ার ৫৫২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৪২৪ টাকা ৯০ পয়সায় নেমে আসে। বিএসআরএম গ্রুপের দুই কোম্পানি বিএসআরএম স্টিল ও বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। এ দুই প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রি ও নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ২০১৭ সালে শেয়ারদর হারিয়েছে। বিএসআরএম স্টিলের শেয়ারের দর ১২৭ টাকা ৬০ পয়সা থেকে কমে ৯৮ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে আসে। এ শেয়ারে লগ্নিকারীরা ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ মূলধন হারিয়েছেন। আর বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের শেয়ারে লগ্নিকারীরা ২২ দশমিক ৫৭ শতাংশ মূলধন হারিয়েছে।

বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনে শীর্ষ গ্রুপ সামিটের তিন প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে নিট মুনাফায় সামিট পাওয়ারের ধারাবাহিকতা থাকলেও খুলনা পাওয়ার কোম্পানির মুনাফা কমেছে। মুনাফায় মিশ্রচিত্র থাকলেও ২০১৭ সালে দুই প্রতিষ্ঠানই দর হারিয়েছে। এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড। আগের বছরের চেয়ে ২০১৬-১৭ সালে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের নিট মুনাফা কিছুটা বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের তা আকর্ষণ করতে পারেনি। ২০১৭ সালে এ শেয়ারটিতে লগ্নি করে বিনিয়োগকারীরা ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ মূলধন হারিয়েছেন। আর আলোচিত সময়ে খুলনা পাওয়ার কোম্পানিতে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও সামিট পাওয়ারে প্রায় ৩ শতাংশ মূলধন হারিয়েছেন লগ্নিকারীরা।

দেশে রংয়ের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের। প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৭ সালে বিক্রি ও নিট মুনাফায় অগ্রগতি হলেও এ শেয়ারে লগ্নিকারীরা ১০ শতাংশের বেশি মূলধন খুইয়েছেন। বস্ত্রশিল্পের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এনভয় টেক্সটাইলে লগ্নিকারীদের লোকসান হয়েছে ১০ শতাংশ। এছাড়া বস্ত্রখাতের অপর কোম্পানি শাশা ডেনিমস থেকে ১৫ শতাংশ এবং স্কয়ার টেক্সটাইলে সাড়ে ৭ শতাংশ মূলধন হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস্-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ‘জেড’ ক্যাটাগরির যে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে সেগুলো বেশিরভাগই ছোট কোম্পানি। এগুলো গুজবের ভিত্তিতে লেনদেন হয়। ফলে দ্রুত এগুলোর দাম বাড়ে। ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমে যাওয়া প্রসঙ্গে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ভালো হলেও ব্যবসা খারাপ হতে পারে। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার কিনেও কখনও মূলধনী লোকসান হতে পারে। এজন্যই শেয়ার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের উপর নির্ভর করা উচিত। কারণ সম্পদ ব্যবস্থাপকরা এ বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে বিনিয়োগ করেন।

ইত্তেফাক/নূহু