শিশু পার্কে অনিয়ম দুর্নীতি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২২:৫০

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেড়ানো শেষ করে শিশু পার্কের উদ্দেশ্যে আসছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজধানীর উত্তরা থেকে ঘুরতে আসা আবুল আসাদ। মূল ফটকের দিকে যাবার সময় শিশুপার্কের পেছন দিকের বের হবার গেট থেকে একজন হাত নাড়িয়ে ডাকতে থাকে। বলা হয়, মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করতে প্রতিজনের ১৫ টাকা লাগবে, এ গেট দিয়ে টিকেট ছাড়া মাথাপিছু ১০ টাকায় ভেতর যেতে পারবেন। পরে দর কষাকষি করে ১১ জনের থেকে ১শ’ টাকা নেওয়া হয়।

প্রতিদিন এভাবেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের টিকেট ছাড়াই কিছু কম ফি দিয়ে ঢাকা শিশু পার্কে প্রবেশ করছে প্রচুর দর্শনার্থী। কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে পার্কের কর্মরত কয়েকজন কর্মচারী বের হবার ফটক দিয়ে দর্শনার্থী প্রবেশ করিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা মেয়াদোত্তীর্ণ খেলনা নিয়ে পরিচালিত হওয়া পার্কটিতে বছরের পর বছর ধরে এমন নানা অব্যবস্থাপনা থাকলেও সেদিকে কর্তৃপক্ষের কোনো দৃষ্টি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোঃ বেলালের সাথে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে আমার জানা ছিল না। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে অতি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯৭৯ সালে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম শিশু পার্কটি পরিপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৮৩ সাল থেকে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে থাকা ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন এ পার্কটিতে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে হাজারের বেশি দর্শনার্থী প্রবেশ করে, যা বিভিন্ন উত্সবে বেড়ে কয়েক গুণ হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের ভেতরে যত্রতত্র হকার। পার্কের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সামনেই হকারদের বাদাম, চানাচুর, ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখা যায়। ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে অর্থ-চুক্তি করেই তারা পার্কে জিনিসপত্র বিক্রি করেন বলে জানান হকারদের একজন।

শিশু পার্কের অভ্যন্তরে ১৫টি বৈধ দোকান বরাদ্দ দিয়েছে ডিএসসিসি। সেসব দোকানের জন্য জায়গা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু ওইসব দোকান মালিকরা নির্ধারিত সীমানার বাইরে খোলা জায়গা দখল করে ছাতার নিচে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে খাবার পরিবেশন করায় খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় দর্শনার্থীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। শিশু পার্কের যেখানে সেখানে রয়েছে ময়লা আবর্জনার ছড়াছড়ি। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্কের আঙ্গিনা পরিষ্কারের জন্য ১১ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকলেও দায়িত্বরত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা রুটিন অনুযায়ী পার্ক পরিষ্কার করেন না। শিশু পার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তদারকির যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মী জানান।

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খোন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন শিশু পার্কের আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। তবে অবৈধ দোকানপাটের কারণে আবর্জনা বেশি হয়। তিনি খোঁজ-খবর নিয়ে পরিষ্কারের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দেন।

এদিকে রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড, বিভিন্ন কসমেটিক ও খেলনা সামগ্রীর দোকানসহ শিশু পার্কের সামনের পার্কিং প্লেসের জায়গায় গড়ে উঠেছে শতাধিক দোকানপাট। একাধিকবার ওইসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও পুনরায় দখলদাররা দোকানপাট বসিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিশু পার্কের সামনের পার্কিং প্লেসের ঠিকাদার ফজর আলীই এসব অবৈধ দোকানপাট থেকে ভাড়া-বাণিজ্য করছেন। তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি অবৈধ দোকান স্থাপন ও ভাড়া বাণিজ্যের ব্যাপারে সত্যতা স্বীকার করে বলেন, পার্কিং প্লেসসহ স্থাপিত দোকানপাটগুলো তার ঠিকাদারীতে ছিল তবে এখন তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত। তারা এখন এসব দেকান থেকে ভাড়া আদায় করে ভাগ করে নেন।

প্রকৌশলী আনিছুর রহমান বলেন, শিশু পার্ক কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকবার এসব দোকান ও হকারদের উচ্ছেদ করলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় আবার বসে পড়ে। যার কারণে উচ্ছেদের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

ইত্তেফাক/নূহু