গুলশান থেকে বকশীবাজার পথে পথে সংঘর্ষ ভাঙচুর

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:৫০

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আদালতে যাবার পূর্ব ঘোষিত সময় ছিল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা। সকাল থেকেই গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘ফিরোজা’ নামে তার বাসার সামনে ছিল পুলিশের কঠোর অবস্থান। সকালে নিকট স্বজন ও বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা তার সঙ্গে দেখা করেন। বেলা পৌনে ১২ টার দিকে পুলিশ ও নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর তদারকিতে আদালতের উদ্দ্যেশে রওনা দেন খালেদা জিয়া। তাকে বহন করা সাদা রঙের নিশান প্যাট্রল গাড়িটি অত্যন্ত ধীর গতিতে এগুতে থাকে। গুলশান থেকে বকশীবাজার বিশেষ আদালত পর্যন্ত আসার পথে তার গাড়িবহরকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

এসময় কাকরাইল মোড়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা পুলিশের দুটি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারা কাকরাইল পুলিশ বক্সেও ভাঙচুর চালায়। পুলিশের সঙ্গে এ সংঘর্ষ চলাকালে বিএনপির অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। তারা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। পুলিশ মগবাজার থেকে বিশেষ আদালত প্রাঙ্গন পর্যন্ত বিভিন্ন স্পট থেকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসানসহ অন্তত অর্ধশত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। সংঘর্ষে ৭ পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গতকাল ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬৫ জন আহত হয়েছে। এসময় মিছিলে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর, রাবার বুলেট নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। এতে বুলেটবিদ্ধ হয়েছেন গাইবান্ধার এক মহিলা দল নেত্রী। এছাড়া চট্টগ্রামের নগর বিএনপি সভাপতিসহ অর্ধশত নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।

এদিকে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাসা থেকে আদালত প্রাঙ্গন পর্য়ন্ত ৮ কিলোমিটার সড়কে বিচ্ছিন্নভাবে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় তাদের অবস্থান পরিলক্ষিত হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় নেতা-কর্মীরা লাঠি নিয়ে মিছিলও করেছে।

পথে পথে সংঘর্ষ : বেগম খালেদা জিয়াকে বহন করা গাড়ির বহর গুলশান-২ ও ১ নম্বর গোল চক্কর হয়ে সাতরাস্তা মোড়ে পৌঁছায় বেলা ১২ টায়। সাতরাস্তা মোড় থেকে রাস্তার দুই পাশ থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। এ অবস্থায় তাকে বহন করা গাড়িটি মাঝে মধ্যেই থেমে যাচ্ছিল। হাতিরঝিল ও এফডিসির আশপাশ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থানকারী বিএনপির কয়েক’শ নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে শ্লোগান দিতে থাকেন। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাতিরঝিল থেকে মগবাজার মোড় পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট লেগে যায়। নেতাকর্মীরা গাড়িবহরের সামনে মিছিল করায়  খালেদা জিয়ার গাড়ির গতি আরো কমিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় গাড়িবহরের সামনে নিখোঁজ বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে দেখা যায়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পাশে পৌঁছায়। এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের পাল্টাপাল্টি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে। এক পর্যায়ে বিপরীত দিক থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলকে ধাওয়া দেয়। তখন সড়ক বিভাজকের ওপর থাকা ছোট ছোট গাছ ভেঙে লাঠি বানিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল করে। এরই মধ্যে এগিয়ে যায় খালেদা জিয়ার গাড়িবহর।

দেড়টার দিকে কাকরাইল মোড়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সামনে পুলিশের সঙ্গে তার দলের কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ ১০-১২ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এরপর কাকরাইল মোড়ে পুলিশ বক্সে ভাঙচুর করে বিএনপি কর্মীরা। ঘটনাস্থলে বিএনপি কর্মীদের ইট-পাটকেলে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য। এসময়  কাকরাইল চার্চ মোড়ে বিক্ষোভকারীরা দুটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এরপর মত্স্য ভবন মোড়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর আসার আগেই বহরের অগ্রবর্তী বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ পাল্টা জবাবে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে পুলিশের ধাওয়ায় পিছু হটে বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় সেখান থেকে একজনকে আটক করা হয়।

এদিকে দুপুর সোয়া ১টার  দিকে পল্টন মোড় থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা  শ্লোগান দিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে কদম ফোয়ারার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় চারপাশে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায়  দোকানপাট। পুলিশ প্রেসক্লাবের উল্টোদিকে বিএমএ ভবনের পূর্বপাশের গলির গেট বন্ধ করে দেয়।

এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বকশিবাজার মোড় অতিক্রম করে।  সেখানে নির্দিষ্ট কিছু গাড়ি ছাড়া সব গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। চানখাঁর পুল এলাকায় এসময় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির কর্মী ও সমর্থকদের সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশ টিয়ার সেল ছুঁড়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে বিএনপির কর্মীরা বাবুপুরার গলি দিয়ে অমর একুশে হলের সামনে অবস্থান নেয়। বেলা পৌনে ২টার দিকে খালেদা জিয়া আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান। বকশীবাজার মোড়ে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদেরও আটকে দেওয়া হয়। এ সময় সেখানে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

বিশেষ আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা : বকশী বাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও র্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মত। অনেকটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবকে সামনে রেখেই পুলিশ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বুধবার গভীর রাত থেকে আদালত প্রাঙ্গনের চারদিকে বিভিন্ন রাস্তায় ১২ টি স্থানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও গণমাধ্যম কর্মীরা ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণ ও পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন আবাসিক ভবনগুলোতে বাসিন্দাদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই এলাকায় নিরাপত্তার জন্য অন্তত ১২ হাজার পুলিশ ও ৩ হাজার র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। পুলিশের ২ টি জল কামান, ৫ টি এপিসি ও ফায়ার সার্ভিসের ১ টি ইউনিট মোতায়েন ছিল।

দুর্ভোগ-ভোগান্তি: গতকাল অনুষ্ঠিত এসএসসি’র ধর্মশিক্ষা পরীক্ষায় পুলিশের নিরাপত্তা বেস্টনীর কারণে বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী ভোগান্তির শিকার হয়। রাজধানীতে যানবাহন সীমিতভাবে চলাচলের কারণে তাদের কেন্দ্রে পৌঁছতেও সমস্যা হয়। অফিসগামী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। গণপরিবহনের অভাব ও অ্যাপস ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা উবার-পাঠাও বন্ধ থাকায় অনেকেই রিকশায় ও হেঁটে যাতায়াত করেছেন। গাবতলী, সায়দাবাদ, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে শতকরা আশি ভাগ গাড়ি ছেড়ে যায়নি। বাইরের জেলা থেকে ঢাকায় বাসও এসেছে অনেক কম।   

ঢাকার বাইরেও সংঘর্ষ-ভাঙচুর :চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সকাল থেকেই নগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী নগর বিএনপি কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনের মাঠে অবস্থান নেন। বেলা দেড়টার দিকে তারা দলীয় কার্যালয় ছেড়ে সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় কার্যালয়ের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। এসময় কার্যালয়ের ভেতর থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হলে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ১৯ জনকে আটক করে। এসময় দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেয়া শাহাদাতকে আটক করা হয়। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দু’টি মামলা করা হবে।

সিলেট অফিস জানায়, নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় । এসময় ২০ জন আহত হন। তখন নগরীতে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। নগরীর দেকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।  এদিকে বিএনপি নেতা সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধূরীকে তার কুমারস্থ বাসা থেকে বের হতে দেয়নি পুলিশ।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলা শহরে বিএনপি, মহিলা দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পৃথক তিনটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল তিনটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও তিন দফায় ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে এবং ২০ নেতাকর্মীকে আটক করে। পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট দু’পায়ে বিদ্ধ হয়ে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ঝর্না মান্নান আহত হন।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, শহরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২০ জন আহত হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে শপিং কমপ্লেক্স, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশা ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এদিকে গত বুধবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান বাবুসহ ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলা শহর মাইজদীর দত্তের হাটে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করতে জড়ো হলে পুলিশ বাধা  দেয়। বিকালে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা জেলা জজ আদালতের সামনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এসময়  ছাত্রলীগ কর্মীরা আইনজীবীদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় তিনজন আইনজীবী আহত হন।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান,  খালেদা জিয়ার রায়ের পর  জেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তিন সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। বিকাল ৩ টার দিকে শহরের গোডাউন রোডে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় লক্ষ্মীপুর সদর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বাসভবনে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান,  উপজেলা সদরে বিএনপি নেতাকর্মীরা রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ ধাওয়া করে। এ সময় পুলিশ ৩৪ রাউন্ড ফাঁকা গুলি (রাবার বুলেট) ছুড়ে। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

ইত্তেফাক/নূহু