“এই রোডোর লাই মাইষি আত্মীয়তা গইত্তু নচাই”

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:৩৮

“এই রোডোর লাই মাইষি আত্মীয়তা গইত্তু ন চাই, এই দুক্কু হত্তে শেষ আইবু ভগমানই হইত পারে” ( এই রাস্তার কারণে মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়তে চাই না, এই দুঃখ কবে শেষ হবে ভগবানই বলতে পারে) রাউজান উপজেলার আর.ডি. মোহম্মদীয়া সড়কের বেহাল দশার বর্ণনা দিতে গিয়ে দুঃখ ভারক্রান্ত মনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এসব কথা বলেন পাহাড়তলী ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গ্রামের বাসিন্দা সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধ দুলাল কান্তি দে।

উপজেলার দক্ষিণপ্রান্তে পাহাড়তলী ও বাগোয়ান ইউনিয়নের বুক চিরে চলে যাওয়া কাপ্তাই সড়কের সাথে কর্ণফুলী নদী তীরস্থ খেলাঘাট ও লাম্বুর হাটের সহজ এই সংযোগ সড়কটি দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সময় ধরে সংস্কার না হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে বেহাল দশা। এই বেহাল দশার অজুহাতে এই সড়কে একমাত্র পরিবহন সিএনজি চালিত অটোরিক্সার চালকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করে, আবার কখনও কখনও একই অজুহাতে গাড়ি চালাতেও অনিহা প্রকাশ করে চালকরা। ফলে এই অঞ্চলে বসবাসকারী চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীদের জরুরী প্রয়োজনে এই সড়কের তিনগুণেরও বেশী দুরত্বের বিকল্প পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্য যেতে হয়। অনেকেই নিরুপায় হয়ে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে গন্তব্যে যাত্রা করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, কাপ্তাই সড়কের দমদমা নামক স্থান হতে দক্ষিণ দিকে কর্ণফুলীর দিকে চলে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটারের এই সড়কের শুরুতে প্রায় ৭ শত ফুট রাস্তা পিচঢালা হলেও সেখানে বিটুমিনের কোন অস্তিত্ব নেই। বাকি ইটের সড়কে কোথাও ইট উঠে গিয়ে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও ইটবিহীন কাদা-মাটির সড়ক, কোথাও ধসে ইট সরে গিয়ে উঁচু-নিচু বন্ধুর পথে পরিণত হয়েছে।

ইঞ্জিন চালিত ট্রাক, পিক-আপ, অটোরিক্সা, মোটর বাইক হেলেদুলে চলাচল করলেও পেশীশক্তি চালিত রিক্সা, ভ্যান চালকদের জন্য সড়কটি খুবই দূর্গম।

এই সড়কের প্রায় আড়াই কিলোমিটার পর রয়েছে দেওয়ানপুর এস.কে. সেন স্কুল এন্ড কলেজ। ১৯৮২ সাল হতে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্র অঞ্চলের পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র। এই উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ১০টি বিদ্যালয়ের কয়েক হাজার পরিক্ষার্থী জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু রাস্তাটির বেহাল দশার কারণে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া পরিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

কেন্দ্রে যাওয়ার প্রায় এক কিলোমিটারের মত সহজ বিকল্প সড়ক হল ‘ভদ্র সেন সড়ক’। এই সড়কটির অবস্থা আর.ডি. মোহম্মদীয়া সড়কের চেয়েও নাজুক।

নাজমা আক্তার নামে এক এস.এস.সি পরিক্ষার্থীর অভিভাবক দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা পরীক্ষার দিন তার মেয়েকে নিয়ে কদলপুর বাড়ি হতে সঠিক সময়ে বের হলেও গাড়ির ধীর গতির ও চাকা আটকে গাড়ি বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কেন্দ্রে সঠিক সময়ে পৌছাতে পারেনি।

এই সড়কের সর্ব দক্ষিণে সংযুক্ত হয়েছে কর্ণফুলীর তীরস্থ ঐতিহাসিক লাম্বুর হাট ও তৎসংলগ্ন ঘাট। যে ঘাট দিয়ে নগরীর চাকতাই হতে নৌপথে সহজে মালামাল আনা হয়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে হাট আর ঘাটে আগের তেমন জৌলুস নেই বলে জানান স্থানীয় বাসিন্ধারা।

এই সড়কে যাতায়তকারী দেওয়ানপুর গ্রামের বাসিন্ধা ৯১ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাদল চন্দ্র পাল দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকে স্থানীয় সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী উদ্যোগী হয়ে এই সড়কে ইট বিছিয়ে দেন। প্রায় ৭ বছর পূর্বে কয়েকটি স্থানে হালকা মেরামত করা হলেও দুই যুগ ধরে রাস্তাটি সংস্কার না হওয়ায় এই খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রোগী, মালামাল, বাজার সদাই নিয়ে এই সড়ক দিয়ে চলাচলে বেশ দূর্ভোগ পোহাতে হয়। তিনি সহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ ও যুবক সড়কটি সংস্কারে স্থানীয় সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী সহ সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সুদৃষ্টি ও হস্তক্ষেপের দাবি জানান।

এই ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান রোকন উদ্দিন দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, কাপ্তাই সড়ক হতে আর.ডি. মোহাম্মদীয়া সড়কের এক কিলোমিটার পর্যন্ত সিসি ঢালায়ের জন্য ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্ধ হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ভদ্র সেন সড়কসহ বাকি দেড় কিলোমিটারের জন্য এক কোটি আটচল্লিশ লক্ষ টাকার চাহিদা প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। এটি বাস্তবায়ন হলে অত্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে বলে আশা রাখি। এই বিষয়ে এমপি মহোদয়ের সুদৃষ্টি রয়েছে।

ইত্তেফাক/নূহু