দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সরকার কাজ করছে

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২৩:৪৫


পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, সুপেয় পানির সংরক্ষণ এবং বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সমস্যার সমাধানে পরিকল্পিত ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি একই সঙ্গে গৃহীত প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধান ও তদারকি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি গতকাল রবিবার বিকালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা কার্যালয়ে  খুলনা জোনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অবহিত হন। এ মতবিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য।

এ সময় মন্ত্রীকে পাউবোর খুলনা জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. লুত্ফর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু হোসেন ও অখিল কুমার বিশ্বাস, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম ও মাহমুদ ইলিয়াস, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সাইদুর রহমানসহ পাউবোর কর্মকর্তাগণ পাউবোর চলমান প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা দেন।

মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে এসেছি। আমি কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। আমাদের সমস্যা অনেক, প্রয়োজনও অনেক। তাই আমাদের সকলকে ধৈর্য সহকারে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, সুন্দরবন না থাকলে আইলা ও সিডরের আঘাত ঢাকায় গিয়ে পৌঁছাতো। তখন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। কিছুসংখ্যক পরিবেশবিরোধী মানুষ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। নদী-খাল আটকে দিচ্ছে। অপরিকল্পিত বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি  করছে। মনে রাখতে হবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণ করে সিডর-আইলার মতো জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো যায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে আরো নতুন নতুন সুন্দরবন সৃষ্টি হচ্ছে। তাই পরিবেশকে ধ্বংস না করে তাকে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। এ অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। সুপেয় পানি সংরক্ষণ করা গেলে মানুষ লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

পানি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনে আমাদের খাল কাটতে হবে। একটি খালের সঙ্গে আরেকটি খালের সংযোগ স্থাপন করতে হবে। নদীর পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। নদী-খাল থেকে লবণাক্ত পানি বের করে দিতে হবে। তাহলেই এ অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানি পাবে।

তিনি বলেন, আমি ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ সব বাঁধের তালিকা নিয়েছি। আগে বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হতো না। এখন জনগণকেও এ সব কাজে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। তাদের মতামত নেয়া হচ্ছে।

তিনি তার মন্ত্রিত্বের বিভিন্ন সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমি আগেও আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। এবারের দায়িত্বগুলোও আন্তরিকভাবে পালন করব। আজ শুধু আমি জানতে এসেছি। আমি ৩৩ বছর আগে খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় দিয়ে মন্ত্রিত্ব শুরু করি। তারপরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, মধ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এখন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরিবেশ বাদে সব সময়ই আমি প্রকৌশলীদের নিয়ে কাজ করছি।

জাতীয় পার্টির সঙ্গে মতবিনিময়

জাতীয় পার্টি- জেপির চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় সংগঠনের খুলনা জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। এখানে তিনি বলেন, দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তবে এ পথ সহজ নয়। হোঁচট খাওয়ার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি সবার প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও হতে পারে। আজকের প্রজন্ম জানে না অতীতের চেয়ে কী পরিবর্তন বাংলাদেশের সর্বত্র ঘটে গেছে। গত ৩২-৩৩ বছরে উন্নয়নের ধারায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক মিল রয়েছে। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা চেয়েছিল, আমরাও স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। দীর্ঘকাল আমাকে আল্লাহতায়ালা মন্ত্রিত্ব করার সুযোগ দিয়েছেন। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের মিল বেশি। তবে জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিএনপিরও মিল রয়েছে। এ দল দুটি আওয়ামী লীগের মতো আন্দোলনকারী দল নয়। ক্ষমতাসীন অবস্থায় জেপি ও বিএনপি দল গঠন করেছিল। ক্ষমতাশ্রয়ী দল ও জনতার মধ্য থেকে ক্ষমতায় আসা দলের চরিত্র এক নয়। ’৯৫-৯৬ সালে আমরাও নির্যাতিত-অত্যাচারিত হয়েছি।

আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের আশাবাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে-যেখানে সবাই সুখে-শান্তিতে সহঅবস্থানের নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে একত্রে বসবাস করবে। দেশজুড়ে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করবে। রাতারাতি কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। পাকিস্তান আমলে নানা কারণে প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটেনি। তখনকার আমাদের চাওয়া স্থায়ী হয়নি। আজ আমাদের এমন আদর্শভিত্তিক রাজনীতি অনুসরণ করা দরকার, যেখানে মানুষের মধ্যে ঐক্য থাকবে, সম্প্রীতি-সমঝোতা থাকবে। এই ধরনের আদর্শভিত্তিক রাজনীতিকেই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। যেখানে ঝগড়া-বিবাদ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত বর্জন করে সবাই মিলেমিশে বসবাস করার পরিবেশ  বজায় রাখা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ একই ভাষাভাষি, অভিন্ন সংস্কৃতি এবং একই ভুখন্ডে বসবাস করি। যার সঙ্গে অনেক দেশের তুলনা চলে না। তাই এ দেশকে আমদের সকলকে ভালোবাসতে হবে। তিনি জাতীয় পার্টির সকল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান।

মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন। বক্তৃতা করেন, খুলনা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোশারফ হোসেন হাওলাদার, মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি এম এস রাশিদা করিম, সাধারণ সম্পাদক কাজী মাছুদ আহম্মেদ, ডা. এম এন আলম সিদ্দিকী, চৌধুরী হাবিবুর রহমান, বাগেরহাট জেলা জেপি সভাপতি সিরাজুল মনি, মুক্তিযোদ্ধা মহম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট মাজহারুল ইসলাম মিলন, মহানগর ছাত্র সমাজ সভাপতি মো. নাজমুল হুদা, জেলা মহিলা দলের আহবায়ক আসমা সিদ্দিকা সুমি, অ্যাডভোকেট দিলিপ কুমার মিস্ত্রি, অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক, ডা. শামীমা পারভীন প্রমুখ। এসময় মঞ্চে ছিলেন জেপির কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার জমাদ্দার, সহ-অর্থবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান টুলু, প্রচার সম্পাদক হুয়ায়ুন কবির তালুকদার রাজু, কেন্দ্রীয় সদস্য ইউসুফ আলী আকন্দ, জেপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম যুববিষয়ক সম্পাদক জাকির হোসেন সুলতান, জাতীয় যুব সংহতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য  রমিজুল ইসলাম সোহাগ প্রমুুখ।

খুলনাস্থ বরিশাল বিভাগীয় সমিতির সংবর্ধনা প্রদান

পানি সম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে গতকাল রবিবার রাতে খুলনাস্থ বরিশাল বিভাগীয় কল্যাণ সমিতি সংবর্ধনা প্রদান করেছে। সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুর রব হাওলাদার, কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মাহবুব হাকিম, সমিতির উপদেষ্টা সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন হাওলাদার, ফিরোজ আলম খান, আব্দুস সালাম মিয়া, শফিকুল ইসলাম মধু, আলহাজ্ব ইসমাইল খান প্রমুখ।

সংবর্ধনার জবাবে পানি সম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, নিজের কাজ ভালোভাবে ও সুষ্ঠুভাবে সফল করা আমাদের সকলের প্রত্যাশা হওয়া উচিত। নিজে সফল হতে হবে। যিনি নিজের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেন তিনিই হচ্ছেন ভাগ্যবান। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে যে সকল জাতীয় নেতা দেশ শাসন করেছেন তারা সকলেই এভাবে নিজেদের ভাগ্য গড়েছেন। স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে মধ্য ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে আমরা গৌরব বোধ করি। তখন বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আমরা মুক্ত করে এনেছিলাম। এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীনতার পর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার মর্ম সকলকে উপলব্ধি করতে হবে।

এদিকে, খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন নদী ও ৩৯টি খাল খননের দাবিতে খুলনা উন্নয়ন ফোরাম পানি সম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে  স্মারকলিপি দিয়েছে। স্মারকলিপিতে ময়ূর, কৈয়া, ভদ্রা ও শালতা নদীসহ ৩৯টি খাল খননের দাবি জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন, মহাসচিব এম এ কাশেম প্রমুখ।

ইত্তেফাক/নূহু