বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) হিসাব শাখায় তালা মেরে ১০দিন আন্দোলন অব্যাহত থাকায় সোমবার বিকেলে নগর ভবনের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিসিসি মেয়র মো. আহসান হাবিব কামাল।
সংবাদ সম্মেলনকালে তিনি বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতেই অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে আন্দোলন করছে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্প্রতি বিসিসিতে বেশ কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম চালু হচ্ছিল এবং কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম শেষ পর্যায় ছিল। বেশ কিছু সংস্থা বৈদ্যুতিক এলইডি বাতি স্থাপন, নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সিডিসির কার্যক্রম শুরুসহ নানান উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য এগিয়ে এসেছিল। এসব কার্যক্রমে বিসিসির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিসহ জনভোগান্তি লাঘব হতো। বিসিসির বর্তমান পরিষদের সময়সীমা প্রায় শেষ হওয়ার পথে তাই আগামী সিটি নির্বাচনে এ পরিষদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই এ আন্দোলন। মেয়র বলেন ২০১৫ সালে সরকার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করার পর তৎকালীন বেতন এক কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২০ কোটি ১০ লাখ টাকা। বাড়তি এক কোটি টাকা বেতন দিতে বিসিসিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অথচ বকেয়া রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে কঠোর ভাবে টিম গঠন করলেও বকেয়া আদায় হচ্ছে না। বিগত দিনে ৩০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ১৫টি টিমের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে অনীহা প্রকাশ করছে। ১২ কোটি টাকা বকেয়া আদায়ে তাদের অনীহা থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে তারা এ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বার বার আন্দোলন করছে। মেয়র বলেন বর্তমান পরিষদের তিনিসহ কাউন্সিলরদের এক বছরের ভাতা উত্তোলন না করে নিয়মিত ও অনিয়মত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিয়ে আসছেন।
বর্তমান ৫ মাসের বকেয়া ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিষয়ে মেয়র বলেন মার্চ মাসের শুরুতেই দু’ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধসহ আগামী জুন মাসের মধ্যে তাদের সকল বকেয়া পরিশোধ করা হবে। এরমধ্যে রমজানের ঈদ ও পহেলা বৈশাখেও বাড়তি টাকা দিতে হবে তা সত্ত্বেও বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিবসহ কাউন্সিলররা বার বার বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করলেও তারা তা মানছে না।
মেয়র বলেন, তাদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন করতেই এ অহেতুক আন্দোলন। কেননা আন্দোলনকারীরা বেতন ভাতার পরিবর্তে অমর্যাদাকর স্লোগান দিয়ে সকলকে অবজ্ঞা করছে। তাদের সাথে সমঝোতাকারীদের দালাল আখ্যা দিয়ে স্লোগান দিচ্ছে যা সম্পূর্ণ ভাবে উদ্দেশ্যে প্রনোদিত। তিনি ইতিমধ্যে বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক সহ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের অবহিত করছেন।
মেয়র বলেন, বিসিসির বর্তমান নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনিয়মিত শ্রমিক রয়েছে ২২শ’ ৩১জন। অথচ মন্ত্রণালয় প্রেরিত সর্বশেষ অগ্রানোগ্রামেও তারা ১১শ’ কর্মী চেয়েছেন। বাড়তি ১১শ’ কর্মীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে অথচ এসব কর্মী পূর্বের মেয়ররা নিয়োগ দিয়ে গেছেন। তাদের বিভিন্ন সময় ছাটাই শুরু করলে আন্দোলন শুরু করে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মেয়র আন্দোলনরতদের উদ্দেশ্যে পর্যায়ক্রমে সাধ্য অনুসারে বেতন-ভাতা নিয়ে আন্দোলন বন্ধ করার আহ্বান জানান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মেয়র বলেন, উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা ধার বাবদ এনে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি যে সকল প্রকল্পের কাজ করতে হয় তার ২০ ভাগ টাকা সিটি কর্পোরেশনকে পরিশোধ করতে হয়। গত দু’বছরের স্মরণকালের বৃষ্টিপাতে নগরীর রাস্তাঘাটের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তা মেরামত করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের কাছে ঠিকাদারদের বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা। এত ধারদেনার মধ্যে থেকেও বর্তমান পরিষদ সাধ্য অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করে আসছে। সাংবাদিক সম্মেলনে বিসিসির প্যাানেল মেয়র কেএম শহিদুল্লাহ, মোসারেফ হোসেন বাদশা, শরীফ তাছলিমা কালাম পলি, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান টিপু সহ ১৫জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে বিসিসির সভাকক্ষে যখন মেয়রের সাংবাদিক সম্মেলন চলছিল তখন আন্দোলনরতা নিচে জড়ো হতে থাকে। মেয়রসহ কাউন্সিলররা বের হওয়ার সাথে সাথে তারা বকেয়ার দাবিতে নানান স্লোগান দিতে থাকে। আন্দোলনকারী নেতা পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা ও নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান জানান, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে বকেয়া বেতনের আন্দোলনের বিষয়ে প্রশাসন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে সমঝোতা সভা হয়। ঐ সভায় অনুযায়ী তাদের দাবিগুলো মানা হচ্ছে না।
আন্দোলনকারীর পক্ষে পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা স্বাক্ষরিত সোমবার বিষয়গুলো উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। ৯টি দাবি সংবলিত ঐ স্মারকলিপিতে বেতন-ভাতা পরিশোধ সহ নানান দাবি জানানো হয়েছে। এ দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যাবে তবে জরুরি নাগরিক সেবাসমূহ এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
