দু’ফসলি বা তিন ফসলি কৃষি জমিতে কোনোভাবেই ইটভাটা গড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না বলে এমন কঠোর নির্দেশ থাকলেও গাংনী উপজেলাতে সে নির্দেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ বছর গাংনী উপজেলার প্রায় দেড় হাজার বিঘা কৃষি জমি গ্রাস করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠে ইটভাটা।
সূত্রমতে, উপজেলায় বর্তমানে পরিবেশ বান্ধব হাওয়া ইটভাটা রয়েছে মাত্র সাতটি। এছাড়া ব্যারেল চিমনির ইটভাটা রয়েছে ২৪টি ও স্থায়ী চিমনির ইটভাটা রয়েছে ৩০টি।
ইটভাটার জন্য ট্রেড লাইসেন্স, বি.এস.টি.আই এর সনদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসক প্রদত্ত লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ইটভাটা স্থাপন করার আইন থাকলেও এ উপজেলায় চরমভাবে তা লঙ্ঘিত হচ্ছে।
ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইনামুল হক জানান, হাওয়ায় ইটভাটার মালিকরা প্রতি বছর ভাটা প্রতি তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা ভ্যাট দিচ্ছে। আর এসব ইটভাটা থেকে সরকার এক কোটি ১৬ লাখ টাকা ভ্যাট পাচ্ছে। অথচ অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলো থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
জানা যায়, স্থায়ী চিমনির ইটভাটাতে প্রতি মৌসুমে ২৫ হাজার মণ, টিনের চিমনিতে ১৮ হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। এ হিসাবে জেলায় প্রতি মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
ব্যারেল চিমনি ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবলু হোসেন বলেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই আমরা ভাটা চালাচ্ছি। শুধু ভ্যাট অফিসকেই প্রতি মৌসুমে এক লাখ করে টাকা দিতে হয়।
তবে মেহেরপুর ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য সেখানে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান জানান, গাংনী উপজেলায় ১২০ ফিট চিমনির ৩০টি ও ড্রাম চিমনির ২৪টি ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের কোনো লাইসেন্স নেই। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নেই।
তাই জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান চালানো হয়। তবে গাংনী উপজেলায় দুটি ইটভাটাতে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট এর সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়েছে।
জেলা কৃষি উপপরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান জানান, ইটভাটার গর্ভে যাওয়া এসব জমি থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মণ আউশ, আমন ধান ও গমের উত্পাদন কমেছে।
গাংনী কৃষি অফিস জানায়, ২০০১ সালের কৃষি শুমারি অনুযায়ী এ উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৫৬৬ হেক্টর।
বর্তমানে আবাদি জমির পরিমাণ ২৫ হাজার ৪৯৫ হেক্টর।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে ইটভাটা বাড়ার কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি আবাদি জমি।
ফলে খাদ্য উদ্বৃত্ত এ উপজেলায় আগামীতে খাদ্য উত্পাদনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছে। স্বাভাবিক নিয়মের দ্বিগুণ হারে আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। এর প্রধান কারণ অস্বাভাবিকভাবে ইটভাটা গড়ে ওঠা।
কৃষি সম্প্রাসরণ বিভাগের উপপরিচালক ড. মো. আক্তারুজ্জামান জানান, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনাটি মেহেরপুর জেলা উন্নয়ন ফোরামের সভায় তোলা হয়েছে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনার পর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও দিনের পর দিন অবৈধভাবে ইটভাটা গড়ে উঠছে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ জানান, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে গত বছর কিছু অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছি।
ইত্তেফাক/নূহু
