মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন চালুর লক্ষ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন রেল লাইনের সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন করেছেন। রবিবার দুপুরে তিনি বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর, বড়লেখা, দক্ষিণভাগ ও জুড়ী স্টেশনসহ রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনা কি অবস্থায় আছে তা ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন ছাড়াও ছিলেন রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) সৈয়দ ফারুক আহমদ, প্রধান প্রকশৌলী (পূর্ব) মো. আরিফুজ্জামান, রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালক এবং রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পথ) মো. তানভিরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (মৌলভীবাজার) মো. রোকন উদ্দিন, বড়লেখার সহকারি কমিশনার (ভূমি) শরীফ উদ্দিন, ভারতীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কালিন্দি (রেল নির্মাণ প্রতিষ্ঠান) সার্ভেয়ার রিপন শেখ প্রমুখ।
রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইনটি বন্ধ আছে। ১৮৮৫ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসেবে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন চালু হয়েছিল। বড়লেখা উপজেলার লাতু সীমান্ত দিয়ে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন হয়ে আসাম রেলওয়ের ট্রেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আসা-যাওয়া করতো। কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনে চলাচলকারী ট্রেনটি এলাকাবাসীর কাছে ‘লাতুর ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনে রয়েছে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা।
এই অঞ্চলের মানুষ কম খরচে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের জন্য লাতুর ট্রেনের উপর নির্ভরশীল ছিল। রেললাইন রেল চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ায় রেললাইন সংস্কার না করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২০০২ সালের ৭ জুলাই লাইনটি বন্ধ করে দেয়। ট্রেন বন্ধ থাকায় নিস্তরঙ্গ হয়ে পড়ে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলি, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর এই ছয়টি রেল স্টেশন।
এদিকে ট্রেন চালুর দাবিতে ট্রেন লাইন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার মানুষ সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যানারে সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে আন্দোলন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী মোঃ শাহাব উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ) অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ী হলে কুলাউড়া-শাহবাজপুর ট্রেনলাইন চালু করবেন। পরে নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী মোঃ শাহাব উদ্দিন। লাইনটি চালুর বিষয়ে তিনি অনেকবার সংসদে কথা বলেন।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন পুনর্বাসন ও চালুর লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ট্রেন লাইন পুনর্বাসনে খরচ হবে ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিবে ১২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ভারত সরকার দিবে ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ৪৪ দশমিক ৭৭ কিলোমিটারের পুরোটাই দ্বৈত গেজ লাইনে পুনর্বাসন করা হবে। এরমধ্যে সাত দশমিক ৭৭ কিলোমিটার লুপ লাইনের কাজ হবে। ট্রেন লাইন পুনর্বাসনের পাশাপাশি ছয়টি স্টেশনের মধ্যে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, বড়লেখা ও শাহবাজপুর বি শ্রেণি এবং কাঁঠালতলি ও মুড়াউল স্টেশন ডি শ্রেণিতে পুনসংস্কার করা হবে। ভারতীয় রেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কালিন্দি পুনর্বাসনের কাজ করবে। এই রেললাইনটি চালু হলে কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচটি ট্রেন চলাচল করবে। লোকাল ট্রেন ছাড়াও আন্তঃনগর ট্রেন চলবে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় ট্রেনও চলবে এ পথ দিয়ে। কাজ শুরুর পর ২৪ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিদর্শন শেষে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন গতকাল রবিবার (১১ মার্চ) দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘রেল লাইন কি অবস্থায় আছে। তা দেখতে এসেছি। রেল লাইনের সার্বিক অবস্থা দেখলাম। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সামনের মাস থেকে এর কাজ শুরু হতে পারে। এমনও হতে পারে যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এটা শুরু করতে পারেন। আরো কিছু প্রকল্প আছে ভারতের সাথে। ওগুলো মিলিয়ে একসাথে কাজ হতে পারে।’
ইত্তেফাক/নূহু
