জ্বলন্ত উড়োজাহাজে ছিল কেবল বাঁচার আকুতি

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০৯:৩৯
 
ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস বাংলার ফ্লাইটটি (ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট) নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে। বিমানটির নেপালে অবতরণ করার কথা ছিল স্থানীয় সময় ২টা ২০ মিনিটে । কিন্তু কাঠামান্ডু পৌঁছে পাইলট প্রথমে একবার ল্যান্ড করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে একপাক ঘুরে যখন দ্বিতীয়বার ল্যান্ড করার চেষ্টা করেন তখন বিমানের বাম দিকটি উঁচু হয়ে যায়। এরপরই সেটি বিধ্বস্ত হয়। একদম হঠাত্ করে সব কিছু হয়ে গেল। এমন একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে তা পাইলট, কেবিন ক্রুসহ কারো কাছ থেকেই আঁচ পাওয়া যায়নি। অথচ স্বাভাবিকভাবেই বিমানটি নামছিল।
 
বিবিসি নেপালি সার্ভিসকে দেয়া সাক্ষাতকারে সেই দুর্ঘটনার  ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ঢাকার একটি স্কুলের শিক্ষক শাহরীন আহমেদ। তিনি তার এক বন্ধুর সঙ্গে সোমবার নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। শাহরীন (২৯) বর্তমানে কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মিজু আহমেদ নামে বেঁচে যাওয়া আরেক যাত্রী বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দুর্ঘটনার পরমুহুর্তে সবাই ভয়ে চিৎকার করছিল আর সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল।
 
বেঁচে যাওয়া কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, ফ্লাইটটি অবতরণ করার পূর্ব মুহূর্তের ঘোষণা অনুযায়ী যাত্রীরা সবাই নিরাপত্তা বেল্ট বেঁধে ফেলেন। ল্যান্ড করার আগ মুহূর্ত থেকেই বিমানটি  দুলছিল। এরপরই বিকট শব্দ করে সামনের অংশ থেকে আগুন ধরে যায়। আগুণ ধরে যাওয়ার ২ /৩ মিনিটের মধ্যে বিমানবন্দরের উদ্ধারকারী ফায়ারসার্ভিস কর্মীরা উড়োজাহাজটি কেটে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। এর মধ্যে  দুয়েকজন উড়োজাহাজটির জানালার কাঁচ ভেঙ্গে নিজেরাই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে ৫ মিনিটের মধ্যে গোটা বিমানে আগুন ধরে যায়।
 
নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে সোমবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৭১ আরোহীর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত প্রধান পাইলটসহ ৫০ জন মারা গেছেন। যারা প্রাণে বেঁচে গেছে তারা শরীরে আঘাত আর দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরালেও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন। তারা সবাই স্বীকার করছেন এটা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা।
 
বিবিসির পাশাপাশি নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমসকে দেয়া শাহরীন আহমেদ বলেন, আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে বিমানে ছিলাম। বিমানটি যখন অবতরণ করতে গেলো তখন এটি বামদিকে মোড় নিতে শুরু করে। লোকজন চিৎকার করতে লাগলো। আমরা তাকিয়ে দেখলাম বিমানে আগুন ধরে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বললো দৌড়ে সামনের দিকে যেতে। কিন্তু আমরা দৌড় শুরু করতেই আগুনের শিখা তাকে ঘিরে ফেললো। ও পড়ে গেলো। লোকজন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিলো, চিৎকার করছিলো আর পড়ে গিয়ে পুড়ে মারা যাচ্ছিলো। তিন ব্যক্তি জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়লো। খুব ভয়াবহ ছিল এ দৃশ্য। ভাগ্যক্রমে কেউ একজন আমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসে। বাইরে প্রচণ্ড রকমের আগুন ছিল এবং আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এরপর সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়। পরে আগুন নিভিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার করা হয়। শাহরীন ডান পায়ে আঘাত পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পিঠও ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।
 
প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি মেহেদি হাসান।  তিনি প্রথমবারের  মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে ছিল সঙ্গে। মেহেদি হিমালয়ান টাইমসকে বলেন, আমার সিটটি পেছনে ছিল। আমি আগুন দেখে স্বজনদের খুঁজতে শুরু করলাম। আমরা জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারে এমন মানুষকে খুঁজছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আত্মীয়দের পাওয়া গেলো না।
 
কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড টিচিং হসপিটালটিতে শাহরিন ও মেহেদিসহ ১২ আহতের চিকিৎসা চলছে। বেঁচে যাওয়া শাহীন ব্যাপারী নামে একজন বাংলাদেশী যাত্রী গতকাল বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে বলেন, ধরে নিয়েছিলাম মৃত্যু নিশ্চিত। বিমানটি নামার পর আঁকাবাঁকা ভাবে ল্যান্ড করছিল। আমি ছিলাম বিমানের পাখা বরাবর। সামনের দিক থেকে আগুন ধরে যায়। আগুন লাগার ২/৩ মিনিটের মধ্যে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে। তবে এ সময় আমার এক পা আটকে ছিল সিটের নীচে। উদ্ধারের পর আমাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
 
অপ দিকে বিবিসি নেপালকে কেশব পাণ্ডে নামের আহত এক নেপালি জানান, তিনি কিভাবে বিমান থেকে বের হয়ে এলেন তা মনে করতে পারছেন না। বেঁচে যাওয়া আরেক নেপালি সানম শাকিয়া। বিধ্বস্ত বিমানের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে সানম জানান, মাটি স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিমানটিতে কোনও ঝামেলা হচ্ছে বলে তিনি বুঝতে পারেননি। বিমানটি উপর-নিচ, ডান-বাম আবার উপর-নিচ করছিলো। সেকারণে আমি ভাবলাম এটি বিমান চলাচল সংক্রান্ত কিছু। কিন্তু পরে যখন বুঝলাম ‘সামথিং ইজ রং’ তখন লাফিয়ে পড়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করলাম।
 
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ