দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে ২৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশে ২৬ লাখ বেকার থাকলেও এবার তা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যানুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে দেশে ১৪ লাখ পুরুষ এবং ১৩ লাখ নারী বেকার। ত্রৈমাসিক বেকারত্বের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ এ সময়কালে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ছিল। এসময় সর্বোচ্চ ২৯ লাখ মানুষ বেকার ছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ড ব্যবহার করে বেকারত্বের এই হিসাব করে এস। ওই মানদণ্ড অনুযায়ী সক্ষম জনগোষ্ঠী যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টাও কাজ করেন না, তাদেরকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এস এর হিসাব অনুযায়ী দেশে ২০১০, ২০১৩ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও বেকার ছিলেন ২৬ লাখ। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে ২৭ লাখ হয়েছে। তবে বেকারত্বের হার আগের বছরের মতো ৪ দশমিক ২ শতাংশে স্থির রয়েছে। শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনটি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ অর্থবছর দেশে রেকর্ড ৭ দশমিক ২৮ ভাগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের হার আগের মতো রয়ে গেছে। কর্মে নিয়োজিতদের সংখ্যা বাড়লেও এর গতি আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এই তথ্যে প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। যে বছর রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেবছর বেকার বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো এই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানে ভালো প্রভাব ফেলেনি। তবে এ বছর বিপুল শ্রমিক দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছে। কিন্তু সেভাবে দেশে নতুন কর্মসংস্থান গড়ে উঠেনি।
এসের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৬ লাখ মানুষ বেকার ছিল। সেই অর্থবছরও জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়কালে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ মানুষ বেকার ছিল। বেকারত্বের হার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর দেশে শহরাঞ্চলে নারী বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। এসময় ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ নারী বেকার হয়েছে। তবে দেশে নারীর কর্মসংস্থানেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এস বলছে, বিগত এক বছরে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ দশমিক ৮ ভাগ। অন্য দিকে, শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে ২ দশমিক ৩ ভাগ। এর মধ্যে পুরুষ শ্রমশক্তি বেড়েছে ১ শতাংশ এবং নারী শ্রমশক্তি বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ ভাগ। এক বছরে মোট ১৪ লাখ নতুন শ্রম শক্তি যোগ হয়েছে। কর্মসংস্থানের নতুন বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ ভাগ। এই হার পুরুষের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৭ ভাগ এবং নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৮ ভাগ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে কৃষি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমেছে ২ দশমিক ৮ ভাগ। শিল্প খাতে বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৮ ভাগ এবং সেবাখাতে বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮ ভাগ। বিগত এক বছরে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে ১৩ লাখ। কর্মে নিয়োজিতদের মর্যাদা অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের গৃহস্থালি কাজে বিনা বেতনে কর্মে নিয়োজিতদের সংখ্যা কমে আসছে। অধিক হারে নারীরা ‘আন পেইড’ থেকে ‘পেইড’ কর্মসংস্থানে আসছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্যে দেখা যায়, দেশে ২০১৭ সালে এক বছরে দশ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ ভাগে অপরিবর্তীত রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে কর্মে নিয়োজিত ছিল ৬ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী রয়েছেন ২ কোটি ১ লাখ। এই তরুণদের মধ্যে ১ কোটি ৩১ লাখ পুরুষ এবং ৭২ লাখ নারী।
এদিকে এসের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্তিকর বলে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এসের হিসাবে জানুয়ারি থেকে মার্চে বেকারত্ব বেশি দেখানো হচ্ছে। অথচ এ সময়কালে দেশে বেশি কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। বর্ষাকালে না বেড়ে কাজের পূর্ণ মওসুমের সময়ে বেকার বেড়ে যাওয়ার তথ্য বিভ্রান্তিকর। এসের তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া কতটা সুষ্ঠু ভাবে হচ্ছে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
ইত্তেফাক/নূহু
