সরকারের নানামূখী চেষ্টা সত্বেও রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে রয়েছে আয়কর আদায়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাস অর্থাত্ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের আয়কর আদায় বেড়েছে ১৫ শতাংশ কম হারে। একই সময়ে রাজস্বের অন্য দুটি খাত ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) ও শুল্ক আদায়ে প্রবৃদ্ধি আয়করের চাইতে কিছুটা ভালো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত আট মাসে আয়কর আদায় বেড়েছে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ শতাংশের উপরে। এনবিআরের হিসাবে, গত আট মাসে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশের কিছু বেশি।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছ প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু গত আট মাসে সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশের নিচে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া আয়কর বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলাদাভাবে শুল্ক ও ভ্যাট কমিশনারদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে কমিশনাররা তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না করতে পারার কারন ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষত সরকারের উন্নয়ন কাজে ধীর গতির কারনে গত আট মাসে এ খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে আয়করসহ সার্বিক রাজস্ব আদায় হয়নি। গত আট মাসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৮ শতাংশ। এর ফলে রাজস্ব আদায়ের এর প্রভাব পড়েছে। জানা গেছে, আয়কর আদায়ে সবচেয়ে পিছিয়ে ঢাকার কর অঞ্চল দুই।
বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের একজন ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতির কারনে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। তবে সাম্প্রতি বছরগুলোতে আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। অথচ এবার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ৩৫ শতাংশ। ফলে এটি কার্যত অসম্ভব। তবে তিনি বলেন, আগামী মাসগুলোতে আদায় আরো বাড়বে এবং জুন নাগাদ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ হবে বলে আশা করছি।
অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে মামলায় আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ে আলাদা নজর দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। জানা গেছে, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক মিলিয়ে বর্তমানে মামলায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রয়েছে। নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া সত্বেও মামলা না কমে উল্টো বাড়ছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এনবিআর কিছু বিজ্ঞ আইনজীবী (রিটেইনার) নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কমিশনারেট তাদের নিজেদের মত মামলা নিষ্পত্তিতে কাজ করছে। তবে এসব মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এনবিআর কেন্দ্রীয়ভাবে ‘বিশেষায়িত’ একটি সেল গঠন করতে চায়। শিগগিরই এ বিষযে কাজ শুরু হবে।
চলতি অর্থবছর ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য অর্থনীতিবিদরা শুরু থেকেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত। কিন্তু ৩৫ শতাংশ আদায়যোগ্য নয়। অতীতের ন্যায় বছরের শেষ দিকে এসে এ লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমিয়ে আনতে হবে।
