রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা এবং কেবল সনদ প্রদানই মূল উদেশ্য নয়; বরং মেধাবিকাশ, উন্মুক্ত চিন্তা-চেতনার উন্মেষ, বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা প্রয়োগের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যাতে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হতে পারে তার দ্বার উন্মোচন করাই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
বুধবার বিকালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের ও ব্যবহার এবং আবিষ্কার সম্পর্কে নিজস্ব কর্মসূচি থাকতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিজেদের জন্য যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং উন্নত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের ব্যর্থ হলে তা যুগের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, ইউসিজিসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে দক্ষ ও নৈতিক মূল্যবোধ দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতি গঠনে প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্ব অত্যাধিক। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা একটি জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করে। প্রকৌশলীদের মেধা, মনন ও সৃজনশীল চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই উন্নতমনের রূপরেখা। তাই প্রকৌশলীদের চিন্তা চেতনায় থাকবে দূরদৃষ্টি সুস্পষ্ট প্রতিফল। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিনিয়তই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাই আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে আন্তর্জাতিকমানের উন্নীত করে এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনে উদ্যোগী হয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষার প্রতিটি স্তরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তি যেন সর্বনাশের বাহন না হয় তার প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রযুক্তি হচ্ছে উন্নয়নের বাহন। কিন্তু এ প্রযুক্তি যাতে সর্বনাশের বাহন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল ফোন বর্তমান সময়ে একটি অপরিহার্য ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী। কিন্তু এই মোবাইল যখন জীবনের ধ্যান-জ্ঞান সব হয়ে যায় তখন সেটি আর ভালো থাকে না।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে নামনে রেখে একটি তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞানভিত্তিক সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে রূপকল্প-২০২১ ঘোষণা করেছেন। এই রূপকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তোমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে এগিয়ে আসবে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরুর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় বিস্ফোরণে নিহত কুয়েটের চার মেধাবী শিক্ষার্থীর স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর। এতে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলী আসগর। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারারণচন্দ্র চন্দ, স্থানীয় সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসমারিক কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংসারে অশান্তি না বাধাতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান রাষ্ট্রপতির
রাষ্ট্রপতির সংসারে অশান্তি না বাধাতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে হাস্য রসের সঙ্গে তিনি বলেন, সোমবার জাজিরা পয়েন্টে আমি পদ্মা ব্রিজ পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম। রাতে জাজিরার একটি রিসোর্টে ছিলাম। রাতে এক ঘণ্টার জন্য শরিয়তপুরের ডিসি আমার সম্মানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেদিন আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু পরের দিন কয়েকটি পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘পদ্মাসেতু দেখতে এসে সস্ত্রীক রাষ্ট্রপতি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করলেন’। সকালে এ খবর আমার স্ত্রী দেখে আমাকে বললেন, আমি তো ছিলাম না, তাহলে তুমি কাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলে?’ তবে রক্ষা আমার বয়স হয়েছে। তাই সংসারে খুব একটা অশান্তি সৃষ্টি হয়নি। তবে বয়স কম হলে কী হতো আপনারা ভাবতে পারছেন?
তিনি হাস্যরসের সুরে বলেন, আজ কুয়েটের সমাবর্তনে অবশ্য আমি একা আসিনি। সঙ্গে আমার স্ত্রী এসেছেন। আবার সাথে করে আমার ছোট ছেলের বউকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আমার স্ত্রী কুয়েটের ভিসির বাসায় আছেন। আর আমাকে পাহারা দেয়ার জন্য বউ মাকে পাঠিয়েছেন। যিনি আপনাদের মাঝেই বসা আছেন। এ সময় সমাবর্তন জুড়ে হাসির রোল পড়ে।
বক্তৃতা শেষে রাষ্ট্রপতি সাংবাদিকদের কাছে এসে আবারো একই কথা পুনরাবৃত্তি করে বলেন, আপনারা না জেনে আগ বাড়িয়ে কিছু লিখবেন না। এতে সংসারে অশান্তির সৃষ্টি হয়। সঠিক তথ্য জেনে সঠিকটাই লিখুন।
ইত্তেফাক/আরকেজি
