অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার বিকালে সিডনিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, এই দুই নেতার মধ্যে দেড় ঘণ্টা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি উঠলে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি তার দেশের সমর্থনের কথা জানান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের জন্য আরও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী। তাদের জন্য অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণের বিষয়েও টার্নবুলকে জানান শেখ হাসিনা। বৈঠকে ওসানোগ্রাফিতেও (সমুদ্র সম্পদ নিয়ে গবেষণা) অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়েও দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন বলে জানান ইহসানুল করিম। বাণিজ্য ও বিনিযোগ বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছেন তারা।
ম্যালকম টার্নবুলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী উপস্থিত ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে সেরা জ্ঞান আহরণ করুন :
শিক্ষার্থীদের প্রতি শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্র সম্পদ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেদিকে নজর দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে এ ব্যাপারে সেরা জ্ঞান আহরণের জন্য সেদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। অস্ট্রেলিয়া সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল শনিবার সকালে সিডনির প্যারাম্যাটায় ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির সাউথ ক্যাম্পাস পরিদর্শনকালে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে উন্নততর জ্ঞান আহরণের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া একটি প্রিয় গন্তব্যস্থল। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশনের মাধ্যমে উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, আমাদের আরো বেশি মানবিক ক্ষমতা দরকার। অস্ট্রেলিয়া এক্ষেত্রে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দান এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দিয়ে অবদান রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সভাপতি প্রফেসর বার্নি গ্লোভার, শিক্ষকবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ডব্লিউএসইউ বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের বিচার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্য প্রশিক্ষণদান কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার জন্য ওয়েস্টার্ন সিডনী বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণ খুবই আনন্দদায়ক হয়েছে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ মুর্তি স্থাপিত হয়েছে দেখে তিনি অভিভূত। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালেই জাতীয় সংসদে আইন করে সমুদ্রসীমা নির্দিষ্টকরণের দূরদৃষ্টি এবং অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তিটি যথার্থই ইনস্টিটিউট অব ওশান গর্ভর্নেন্স (আইসিওজি)-র সামনে স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতার কথা স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের পর থেকেই দু’দেশের মধ্যে উষ্ণ আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে খুবই মৌলিক দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্কের শুরু তখন থেকেই। কারণ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়াই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দেশ।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতিগঠনের প্রারম্ভিক দিনগুলোতে সহায়তা প্রদানকারী হিসেবে সাবেক অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড গফ হোয়াইটলাম এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতিও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। অস্ট্রেলিয়ার তত্কালীন ফেডারেল সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হোয়ইটলাম বাংলাদেশের স্বপক্ষে দ্বিদলীয় ঐকমত্য গঠনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের অধীনে হানাদার ও তাদের সহযোগীদের নিপীড়নে বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি দেয়ার বিষয়টি স্মরণ করেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। বিকেলে সিডনীর সোফিটেল হোটেলে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসু রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা ড. মিল্টন হাসনাত, গামা আব্দুল কাদির, আনিসুর রহমান রিতু, প্রদ্যুত সিং চুন্নু এবং অস্ট্রেলিয় আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল হক অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংবর্ধনা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক শেখ শামিমুল হক। অস্ট্রেলিয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
ইত্তেফাক/এএম
