জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি ক্রমশ বিরূপ হয়ে উঠছে। তীব্র বাতাস, ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, তাপদাহ, ঝড় এবং তুমুল বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বজ্রপাতের হারও বাড়ছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একই চিত্র। তীব্র গরমের পরপরই হঠাত্ ঝড়ো হাওয়া। এরপর তুমুল বৃষ্টি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বজ্রপাতের হার বেড়ে যাওয়া। এর ফলে প্রাণহানি বাড়ছে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেয়া যাচ্ছে না। এক হিসাবে দেখা যায়, ধরিত্রির তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের হার ১২ শতাংশ হারে বাড়ে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ৮ বছরে দুই হাজারের কাছাকাছি প্রাণ ঝরে গেছে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় মৃত্যু হার বেশি। বজ্রপাত ঠেকাতে সরকার সারাদেশে তাল গাছ রোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ ছাড়া কীভাবে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায় সে লক্ষ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করে যাচ্ছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞরা মানুষের সচেতনতার ওপরই জোর দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
চলতি মাসে একসঙ্গে আবহাওয়ার বহুরূপ দেখছে বাংলাদেশ। গত ৩৫ বছরের এপ্রিল মাসের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ সময়ের স্বাভাবিকের চেয়ে বজ্রপাতও বেড়েছে। তাপবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত বাড়ায় বজ্রপাতসহ কালবৈশাখীর তাণ্ডব তীব্র হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩ মিলিমিটার। অথচ এ বছর গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। গত বছর অনেক বৃষ্টিপাত হলেও এবার ইতোমধ্যে তা ১৪ শতাংশ বেশি। আর ৩৫ বছরের মধ্যে এত বৃষ্টিপাত কখনো হয়নি। এর আগে ১৯৮১ সালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, কালবৈশাখীতে প্রবল বৃষ্টি এবং বজ্রপাত হয়। এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হচ্ছে। তবে এটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নয়। এটিকে জলবায়ু বৈচিত্র্যও বলা যায়। প্রতি ২০-৩০ বছরে এমনটি হয়।
আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, বাতাসে উচ্চচাপ বলয় যত শক্তিশালী হয় কালবৈশাখী তত কম হয়। এবার দুর্বল থাকার কারণে পূবালি-পশ্চিমা লঘুচাপের সংমিশ্রণ বাংলাদেশের ওপর বেশি সক্রিয় হয়েছে বলে বর্ষণ বেশি হচ্ছে।
গত বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় প্রতিদিন কালবৈশাখী পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সবগুলো জোরালো হয়নি। কয়েকটি জোরালো হয়ে বৃহত্তর কুমিল্লার ওপর দিয়ে বাংলাদেশ সীমানা ছাড়ে। কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়ে তুমুল বৃষ্টিপাত এবং বজ্রপাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মারা গেছে কয়েকজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বৈশাখে আমাদের দেশের উত্তরে ও হিমালয়ের দিকে বায়ুর চাপ বেশি থাকে। তাই উচ্চচাপের উত্তরাঞ্চল থেকে বায়ু প্রবল বেগে দক্ষিণ দিকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়ে কালবৈশাখী তৈরি হচ্ছে। কালবৈশাখীর বাতাসের গতি ঘণ্টায় গড়ে ৬০ কিলোমিটার হলেও এবার শুধু ঢাকাতে ঝড়ের সময় গতিবেগ থাকছে ৭৫ থেকে ৮৫ কিলোমিটার।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাভাবিকের চেয়ে কালবৈশালী তীব্র হলেও এটি আশঙ্কাজনক নয়। এ সময় সবশ্রেণির মানুষকেই বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড় এবং কালবৈশাখীর প্রস্তুতি রাখা উচিত। তবে চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
