ফিটনেসবিহীন লঞ্চে রঙ জোড়াতালির হিড়িক

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৮, ০৫:০১
ঈদকে সামনে রেখে লঞ্চ মালিকরা নতুন-পুরনো সব ধরনের লঞ্চেই ঈদে যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য নৌপথের বিভিন্ন রুটে নামছে হাজারেরও বেশি ছোট-বড় লঞ্চ। এ সব লঞ্চের বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন। এ ছাড়াও ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর আশপাশের ডকইয়ার্ডগুলাতে আরো কয়েকশ’ চলাচলের অযোগ্য লঞ্চ ঈদে ঘরমুখো যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই রুটে শতাধিক ছোট-বড় পুরনো লঞ্চ রং ও জোড়াতালি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী আনা-নেওয়া করছে। বুড়িগঙ্গার আশপাশের এ সব ডকইয়ার্ডে চলাচলের অযোগ্য শত শত লঞ্চকে ঈদে ঘরমুখো যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
 
জানা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে রহমানের ডকইয়ার্ড, সাত্তার খান ডকইয়ার্ডসহ কেরানীগঞ্জের তেলঘাট থেকে মীরেরবাগ পর্যন্ত প্রায় ২৭টি ডকইয়ার্ড রয়েছে। প্রায় সকল ডকইয়ার্ড ঘুরে জানা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে অনেক মালিক দুই মাস আগে লঞ্চ ডকইয়ার্ডে ওঠানোর জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন। প্রতিটি ডকইয়ার্ডেই বিভিন্ন নৌযান তৈরি, সংস্কার ও রঙের কাজ চলছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ডকইয়ার্ডেই চলছে ফিটনেসবিহীন ও ভাঙ্গাচোরা লঞ্চ মেরামত, পুরোনো লঞ্চে রংসহ নানা ধরনের কাজ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শরিফুল্লাহ ডকইয়ার্ডে, ছাত্তার খান ডক ইয়ার্ড, অগ্রগতি ডকইয়ার্ড অ্যান্ড শিপবিল্ডার্স, লার্ট ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ডকইয়ার্ডে জামাল-৯, প্রিন্স রাসেল-৪, সুন্দরবন-১০, মর্নিংসান-৯, কালাম-১, ইয়াদ-৩, মানিক-১, কর্ণফুলী-১১, মানিক-৯, অভিযান-৭ নামের লঞ্চগুলোর মেরামতের কাজ চলছে।
 
সাত্তার খান ডক ইয়ার্ডে মেরামতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা-টরকীগামী নিউসান লঞ্চ-এর ফোরম্যান শফিকুল ইসলাম জানান, নিউসান লঞ্চের প্লেট ও সামনের ফ্যান ফেটে গেছে। এ ছাড়া ঈদের আগে যাত্রীদের আকর্ষণে লঞ্চটি সংস্কার ও রঙ করা হচ্ছে। নিউসান লঞ্চটি মেরামতের জন্য আনা হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে সেটি ছাড়া হবে। তিনি জানান, ছোট আকারের এ লঞ্চটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগবে। সামনে ঈদ, তাই তড়িঘড়ি করে লঞ্চটি সংস্কার করা হচ্ছে। নিউসান লঞ্চটির পাশেই একই কোম্পানির মর্নিংসান-৯ লঞ্চটি সর্ম্পকে তিনি বলেন, এ লঞ্চটি পুরো সংস্কার করতে হলে ৪ থেকে ৫ মাস লাগবে। ঈদকে সামনে রেখে এটি আংশিক সংস্কার করতে আনা হয়েছে। সংস্কার কাজ পরিদর্শনে বা ফিটনেস পরিদর্শনে বিআইডব্লিউটিএ এর পরিদর্শক এলে তারা কি করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু টাকা দিলে তারা চলে যায়।
 
অগ্রগতি ডকইয়ার্ডে সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা-ভান্ডারিয়া রুটের অগ্রদূত প্লাসের সুপারভাইজার ফারুক বলেন, সবাই চায় ঈদের সময় নতুনত্ব আনতে। তিনদিন আগে লঞ্চটি ডকইয়ার্ডে আনা হয়েছে। লঞ্চের ভাঙাচোরা কাজের সংস্কারের পর রঙ লাগিয়ে আগামীকালই লঞ্চটি ছাড়া হবে।
 
বিআইডব্লিউটিএ’র এক কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে ৪৩টি নৌপথে প্রায় শতাধিক লঞ্চ চলাচল করে। এগুলোর মধ্যে হাজার দশেক ভিআইপি, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কেবিন রয়েছে। এ লঞ্চগুলোতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক যাতায়াত করে। আর ঈদের মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এ সময় অতিরিক্ত যাত্রীর লোভে কিছু অসাধু লঞ্চমালিক লক্কড়-ঝক্কড়, চলাচলে অনুপযোগী লঞ্চ সংস্কার ও রং করে লঞ্চগুলোকে চাকচিক্য করে তোলেন। অনেক সময় দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে বসা লঞ্চও নিয়ে আসেন।
 
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারি লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চের রঙ করা সম্পর্কে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোনো লক্কড়-ঝক্কড় লঞ্চ নেই। শিপিংয়ের  সার্ভে ছাড়া কোনো লঞ্চ ছাড়ার সুযোগ নেই। প্রতিবছর সিপিং কর্তৃপক্ষ লঞ্চের ফিটনেস পরীক্ষা করে সার্ভে সনদ দিয়ে থাকেন। তবে ঈদ উপলক্ষে লঞ্চে রঙ ও সংস্কার করা হয়ে থাকে।
 
বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক ইত্তেফাককে বলেন, সার্ভে সনদ ছাড়া এবার কোনো লঞ্চকে ঘাটে ভিড়তে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া এবার প্রত্যেকটি ঘাটে ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবার যে মাস্টাররা লঞ্চ চালাবেন, তাদের সার্টিফিকেটও চেক করে দেখা হবে। সবকিছু তদারকির জন্য সার্বক্ষণিক নৌ-পুলিশের পাশাপাশি কোস্টগার্ড দায়িত্ব পালন করবে বলেও জানান তিনি। মোজাম্মেল হক বলেন, অন্যবারের চেয়ে এবার কড়া নজরদারী আরোপ করা হয়েছে। একটি লঞ্চও যেন অনিয়ম করতে না পারে, সেদিকেও বিশেষ নজরদারি করা হবে।
 
ইত্তেফাক/কেআই