একাধারে দশবার বাজেট দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৮৫ বছর বয়সে জীবনের ১২তম বাজেট বক্তৃতায় তিনি শুনিয়েছেন আশার কথা। বলেছেন দেশের অপার সম্ভাবনা আর তরুণদের কথা। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সুযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতে তিনি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেইসাথে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯র এর গণআন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণ করেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তার স্বজন ও অন্যান্য শহীদ ও জাতীয় চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সরকারের ঈর্ষণীয় সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ি বলে একদিন যে দেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, সে দেশ বিশ্ববাসীর কাছে এখন এক উন্নয়ন-বিস্ময়।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার গর্বের বিষয় হলো যে বিগত শতাব্দীর ৭০ ও ৮০’র দশকে আমি ‘বিশ্ব ভিক্ষুক’ বলে অবহেলিত হয়ে আজকে সফল একজন অর্থমন্ত্রীর সম্মান পাচ্ছি। আমি মনে করি আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী কার্যক্রম ও গণহত্যা সংগঠনকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা ও প্রধান অপরাধীদের শস্তি কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অথবা জাতীয় কোন হুমকির কাছেই নতি স্বীকার করেননি। তার অনন্য সাহসী পদক্ষেপ জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে।
বাজেট বক্তৃতার উপসংহারে তিনি বলেন, আমাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের বিস্তৃত উপাখ্যান তুলে ধরার সুযোগ তেমন থাকেনা। কিছুটা আভাস দেওয়া যায় মাত্র। আমার বিরূদ্ধে অভিযোগ হলো যে, আমি লম্বা ও বিস্তৃত বাজেট বক্তৃতা দেই। সেটা ঠিক বটে, তবে এ বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো জনগণের দৃষ্টি বাজেটের প্রতি নিবদ্ধ করা। সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্য এসেছে বলে আমার মনে হয়।
বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও বাজেটের আকার বেড়েছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি পেতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া দেশের জনগণের জীবনমানে মৌলিক পরিবর্তন আনার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি। সঙ্গত: কারণেই শুরুর দিকে আমরা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে বেশি নজর দিয়েছি। সামনের দিনগুলোতে আমরা প্রবৃদ্ধিকে সুসংহত ও টেকসই করবো। পাশাপাশি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মাধ্যমে সম্পদ ও সেবায় আপামর জনসাধারণের সহজ সুযোগ গ্রহণ নিশ্চিত করে উন্নয়নের সুফল সকলের নিকট পৌঁছে দিবো।
তিনি উল্লেখ করেন, বিগত দশ বছরে আমার প্রচেষ্টার সাথে ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপ্রেরণা ও প্রাজ্ঞ দিকনির্দেশনা, মন্ত্রিপরিষদে ও জাতীয় সংসদে আমার সুযোগ্য সহকর্মীবৃন্দের সহযোগিতা এবং প্রাজ্ঞজনের গঠনমূলক সমালোচনা। তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে দেশকে কতটা দিতে পেরেছি তার মূল্যায়ন দেশবাসী আর বিশ্ব করছে। তবে, এটুকু দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি আমার মননে ও কর্মে আমি কেবল আমার দেশের অগ্রযাত্রাকে বিবেচনায় রেখেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা আমাকে বিস্মিত ও স্বপ্নচারী করে। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি কতটা আঘাত সহ্য করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে এদেশের জনগণ, স্বল্প সম্পদ ও সীমাহীন সীমাবদ্ধতার মাঝে ‘বাসকেট কেস’ এর অপবাদ কাটিয়ে একটি দেশ কিভাবে ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ হয়ে উঠে। যে দেশের শ্রম বাজার আছে ২ কোটিরও অধিক সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণী, যে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রত্যন্ত গ্রাম-পাড়া-মহল্লা এমনি দুর্গম পার্বত্য এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত, সেখানে এখনও অনাবিস্কৃত রয়েছে অমিত সমুদ্র সম্পদ, প্রতিনিয়ত যেখানে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। যে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ১৬ কোটি স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ সে দেশের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত বা প্রতিরোধ করার সাধ্য কারো নেই। এখন প্রয়োজন কেবল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব কিছুর সুসমন্বয় এবং সঠিক ও সুযোগ্য নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। সমৃদ্ধ আগামীর পথে বাংলাদেশের অভিযাত্রার রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়নে আমি বয়সের কারণেই হয়ত তেমন ভূমিকা রাখতে পারবো না, তবে কাজ যে শুরু হয়েছে তাতে আমি খুবই তৃপ্ত ও নিশ্চিত। অবশ্যই সে উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার চেষ্টা করবো। আমি নিশ্চিত এ বাজেট বাস্তবায়নে দেশের আপামর জনগণ তাদের উদ্যোগ, সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা, অংশীদারিত্ব এবং সর্বতোভাবে স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে অংশগ্রণ করবে।
ইত্তেফাক/এমআই
