ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক পুতিনের জন্য বড় জয়

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৮, ১১:২৮
তারা একজন অপরজনের প্রশংসায় মুখরিতই থাকেন। দূর থেকে একজনের মুখে আরেকজনের প্রশংসা শোনা যায় প্রায় নিয়মিতভাবেই। এবার সে প্রশংসা সামনা-সামনি করার সুযোগ এসেছে। প্রথমবারের মতো আজ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দু’জনের পার্থক্য হচ্ছে,  ট্রাম্পের জন্য বৈঠকটি তার দেশে সমালোচনার ঝড় বইয়ে আনলেও, পুতিনের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি ভূরাজনৈতিক জয়। 
 
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন পক্ষেরই এই বৈঠক থেকে উচ্চ ফলাফল লাভের প্রত্যাশা নেই।  সর্বোচ্চ যেটা দেখা যেতে পারে সেটি হচ্ছে, দুই নেতার মধ্যে উষ্ণ আলোচনা, ভেঙ্গে যাওয়া মার্কিন-রাশিয়া সম্পর্কের মেরামত নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি, আর হয়তো সিরিয়া ইস্যু ও পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোন চুক্তি। 
 
ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েই, দূর থেকে অপরজনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন এতদিন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মধ্যকার এই বৈঠক শেষে উভয় দেশে তাদের দূতাবাস পুনরায় কার্যকর করা হতে পারে। 
 
সম্প্রতি ট্রাম্প সিবিএস’কে বৈঠকটি নিয়ে বলেন, তিনি একেবারে নগণ্য প্রত্যাশা নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনও একইরকম কথা শুনিয়েছেন। এবিসি’তে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই বৈঠক থেকে কোন ফলাফলের প্রত্যাশা করছে না। এই বৈঠকটি সুসংগঠিত নয়। 
 
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও একই ধরণের কথা বলেছেন। রাশিয়ার আরটি টিভিকে তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়াও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক থেকে তেমন কোন ফল লাভের প্রত্যাশা করছে না। দুই দেশের মধ্যকার কয়েকটি যোগাযোগের ব্যবস্থা পুনরায় খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেই তাদের জন্য এটি একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হবে। 
 
পুতিনের জন্য অবশ্য এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়াই একটি বড় জয়। বহুদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টায় ছিল এবং আছে। আমেরিকানদের মধ্যে রাশিয়া পছন্দ করেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই বৈঠকের মানে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াকে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, যাদের স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনা করা দরকার। তাই রাশিয়ার জন্য, এই বৈঠকটি হচ্ছে, তাদেরকে একঘরে করে দিতে পশ্চিমা বিশ্বের এতদিনের চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণ করা। 
IMG0
কিন্তু ট্রাম্পের জন্য বরং অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। ইতিমধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১২জন রুশ গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ করেছিল। এছাড়া, তার শিবিরের সঙ্গে রাশিয়ার সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। হোয়াইট হাউজ থেকে পুতিনের সঙ্গে তাকে বৈঠকে না বসতে চাপ দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সব অগ্রাহ্য করে বৈঠকে বসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এই বৈঠকটি ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে।
 
মস্কো-ভিত্তিক থিংক-ট্যাংক আরআইএসি’র প্রধান অ্যান্ড্রি কর্তুনভ বলেন, আমরা এটা জোর দিয়ে বলতে পারি যে, এই বৈঠকে ট্রাম্পের চেয়ে  পুতিনের রাজনৈতিক ঝুঁকি নিশ্চিতভাবেই কম।
 
তিনি বলেন, পুতিনের এইখান থেকে হারানোর চেয়ে জেতার সম্ভাবনা বেশি। কেননা, দেশে তার কোন বিরোধী নেই। নেই কোন আক্রমণাত্মক পার্লামেন্ট। আর তিনি ট্রাম্পের মতন তদন্তাধীনও নন। 
 
কর্তুনভ বলেন, কিন্তু আপনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাদের গণমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকেই বেশি নজর দেয়। সেখানে কেউ বিশ্বাস করে না যে, এই বৈঠক থেকে ভালো কিছু বের হয়ে আসবে।
 
ফিনল্যান্ডের  রাজধানী হেলসিনকিতে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকটি শুরু হওয়ার আগ দিয়ে ট্রাম্প নিজের বেশকিছু কর্মকাণ্ডের কারণে সমালোচনা কুড়িয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ন্যাটো জোটের সামরিক মিত্রতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা, ব্রিটেনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কথিত সম্পর্ক টানাপোড়নে ফেলা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলে আখ্যায়িত করা ইত্যাদি। 
 
এমতাবস্থায়, ট্রাম্প নতুন কি করবেন তা নিয়ে কিছুটা আতঙ্কে আছে প্রায় পুরো বিশ্বই। এর মধ্যে পুতিনের সঙ্গে এই বৈঠকে ট্রাম্প কি বলবেন বা করবেন তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা বেশ উদ্বিগ্ন রয়েছেন। 
 
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে এ বিষয়ে কোন অবাক করা ফল প্রত্যাশা করছেন না কেউই। এছাড়া, বাল্টিক অঞ্চলে ন্যাটোর যুদ্ধ-খেলা বন্ধ করা নিয়েও আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প।
IMG1
গতমাসে, ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি পুতিনকে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু বলবেন কিনা! জবাবে ট্রাম্প জানান, দেখা যাক। তাই এ বিষয়েও তেমন কোন ফল প্রত্যাশা করছেন না বিশেষজ্ঞরা। 
 
ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ নিয়ে অনেক পশ্চিমা নেতাই রাশিয়ার ওপর ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছেন। এছাড়া, ইউক্রেইনে রুশ-পন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থনের বিষয়েও ক্ষোভান্বিত অনেকে।
 
এসব ছারাও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ইউরোপের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, ইউক্রেইনে একটি যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস করতে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করেছে, ব্রিটেনে পক্ষত্যাগী রুশ গুপ্তচরকে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করেছে। 
 
সবমিলিয়ে, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসে অনেক মিত্রকে রাগাতে চলেছেন ট্রাম্প। দেশে ও বিদেশে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ফেলতে যাচ্ছেন ঝুঁকিতে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বের বহুদিনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণ করতে চলেছেন পুতিন। এটা কেবল রাশিয়ার জন্য কোন ভূরাজনৈতিক জয়ই নয়। এটা পুতিন সম্পর্কে যে মহাশক্তিধর ভাবমূর্তি পশ্চিমা নেতারা লালন করে আসছেন, সে ভাবমূর্তিও সত্য প্রমাণ করা।
 
ইত্তেফাক/ জেআর