বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণ সঠিক আছে বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, ভল্ট থেকে কিছু বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা মোটেও নেই। সেখানে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, গভর্নরও অনুমতি ছাড়া ভল্টে যেতে পারেন না।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের রক্ষিত স্বর্ণ বদলে যাওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে আইনানুগভাবে খতিয়ে দেখা হবে, যাতে সামান্যতম সংশয় বা সন্দেহও দূরীভূত হয়।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে বৈঠকের পর সচিবালয়ে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলাম এবং এনবিআর সদস্য কলিপদ হালদার উপস্থিত ছিলেন।
বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই ঘটনাকে মোটেও ছোট করে দেখা হচ্ছে না, কারণ সামান্য ফাঁক দিয়েও বড় সমস্যা হয়ে যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণ নিয়ে পত্রিকার খবর দেখে প্রথমে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি যতটুকু সম্ভব বিভিন্ন জায়গায় কথাবার্তা বলে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, আমার মধ্যে যে ভীতি ছিল, মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ তা কমে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনা করে আশ্বস্ত হয়েছে, যে মাত্রায় খবর পরিবেশিত হয়েছে তা সঠিক নয়। এ সম্পর্কে ভয়ের কোনো ব্যাপার নেই। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন মাঝেমধ্যে ধারণাগত ফারাক হতে পারে, এটি নতুন কিছু নয়। ভল্টের স্বর্ণ ঠিক আছে দাবি করে তিনি বলেন, জমা রাখার সময় ৪০ শতাংশ স্বর্ণ ছিল। কিন্তু ইংরেজিতে ৪০ এর জায়গায় ৮০ লেখা হয়েছে। এটি ক্লারিক্যাল এরর। লেখার মধ্যে ইংরেজি বাংলা মিলে যাওয়ায় এমন হয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরে আসলে বিষয়টি তাকে জানানো হবে। অর্থমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন বিষয়টি নিয়ে আর কী করা যায়, যাতে করে সামান্যতম সংশয় বা সন্দেহ থাকলে দূরীভূত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক যাকে ক্লারিক্যাল ভুল বলছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা পর্যালোচনা করব, যদি কারো গাফিলতি পাই সামান্যতম, তাহলে আইনানুগ শাস্তির বিধান করা হবে। এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে কি না সে প্রশ্নে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে এটা আইনানুগভাবে দেখা হবে।
গিয়াসউদ্দিনের বক্তব্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনা নিয়ে দেশজুড়ে এখনো আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ভল্টে রক্ষিত সোনার কোনো ধরনের হেরফের হয়নি। যা হয়েছে ইংরেজি-বাংলায় হিসাব লেখার হেরফেরে। এ ভুলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত শখ জুয়েলার্সের মালিক গিয়াস উদ্দিন স্বর্ণকারকে দায়ী করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে গিয়াস উদ্দিন বলছেন ভিন্ন কথা। গতকাল তিনি বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের রাখা চাকতিতে তিনি ৪০ শতাংশ সোনা থাকার কথা বললেও ভুলক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ডবুকে তা ৮০ শতাংশ লেখা হয়। আর এসব তথ্য লিখেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা।
গিয়াস উদ্দিন বলছেন, ২০১৫ সালের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যখন শুল্ক গোয়েন্দারা সোনা রাখতে আসে, তখন আমাকে বলা হয়েছিল কোন মানের এবং কী পরিমাণ সোনা আছে তা পরিমাপ করে বের করে দিতে। তখন আমি কষ্টিপাথরে সোনার মান যাচাই করে ৪০ শতাংশই বলেছিলাম; কিন্তু তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ডবুকে যিনি লিখছিলেন তিনি ভুলে ইংরেজিতে ৪০-এর জায়গায় ৮০ লিখেছিলেন। আমি তো বলার সময় ঠিকই বলেছিলাম; কিন্তু উনারা লেখার সময় বাংলার বদলে ইংরেজিতে লিখেছেন। প্যাঁচটা লেগেছে এখানেই, লেখার সময়।
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের জমা দেওয়া ওই সোনার চাকতি কমানো বা ছোট করার সুযোগ আছে কীনা এ বিষয়ে গিয়াস উদ্দিন বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ ওই দিন দুইটি চাকতি জমা দিয়েছিল। দুইটি চাকতি জমা রাখার সময়ও আমি পরিমাপ করে দেখেছি, সোনা ছিল গড়ে ৪০ শতাংশ, এখনো তা-ই আছে। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কি কোনো স্বার্থ থাকতে পারে কীনা সে বিষয়ে তিনি বলেন, তাদেরও হয়ত কোনো স্বার্থ নেই। তারা তো পরিদর্শন করেছে।
আমি যতদূর জানি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সময়ে কে বা কারা অভিযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষিত ভল্টে সব সোনা পাথর হয়ে গেছে। ভল্টে কোনো সোনা নেই। সব সোনা বাইরে চলে গেছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের ভেতরে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ পরিদর্শন করে; কিন্তু পরে তারা দেখতেও পেয়েছে, সোনা এক রতিও কমেনি বরং বেড়েছে।
ইত্তেফাক/মোস্তাফিজ
