রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান সম্মুখযুদ্ধে দু’চোখ হারানো মুক্তিযোদ্ধা মান্নান

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৮, ২০:২৪
স্বাধীন দেশে ৪৭ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি মুক্তিযুদ্ধে দু’চোখ হারানো সাহসী যোদ্ধা আব্দুল মান্নান। তাকে দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে অঝোরধারায় কাঁদলেন ও কাঁদালেন যশোর সদরের মুন্সেফপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আমার আসলে আর কিছুই বলারও নেই, চাওয়াও নেই। শুধু মৃত্যুর আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই।’ 
 
শুক্রবার প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানকে ‘সুন্দর বাংলাদেশ চাই ফাউন্ডেশন-এসবিসি’ এই সংবর্ধনা দেয়।
 
অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের হাতে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট এবং দশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড তুলে দেন। একইসঙ্গে তার নাম যাতে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় সন্নিবেশিত হয়, সেলক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার অঙ্গীকার করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কাজী আনিসুজ্জামান আরজু। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন। 
 
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, স্বীকৃতি না পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান যশোর সদরের মুন্সেফপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা। ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম এই সাহসী যোদ্ধা যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন, তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় আব্দুল মান্নানের বাবা খুলনায় ইস্টার্ন জুট মিলে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে তিনি হঠাৎ করেই বাড়িছাড়া হয়ে যান। ওইসময় তার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু মথুরাপুরের মোশাররফকে নরেন্দ্রপুর এলাকার জল্লাদ আফসার নামে এক রাজাকার বন্দুকের বাট মারে এবং শাসায়, মুক্তিবাহিনীতে গেলে মেরে ফেলবে। এই ঘটনাটি তার মনে ব্যাপক দাগ কাটে। তাই মা-বাবা কিংবা বন্ধু মোশাররফকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন; এই জানোয়ারদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে।
 
তার প্রশিক্ষক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব মিন্টু। যশোর সদরের একডালা-বটতলা এলাকায় তিনি তরুণ যোদ্ধা রেজা কাজী, ফরিদ, শান্তি, আব্দুল মান্নানসহ ১৫-১৬ জনকে রাইফেল চালনা থেকে শুরু করে ক্রলিং, সেফটিনেট, গ্রেনেড নিক্ষেপ ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মান্নান সোজা ভারতে চলে যান। বনগাঁওয়ের চাপাবাড়িয়া ট্রেনিংক্যাম্পে অস্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
 
আব্দুল মান্নান জানান, ৬ ডিসেম্বর কমান্ডার আনোয়ার হোসেন, ডেপুটি কমান্ডার চুয়াডাঙ্গার লতার নেতৃত্বে আব্দুল মান্নান, বরিশালের হানিফ, নারকেলবাড়িয়ার মুসা, উথলির মান্নানসহ (২) ১১ জন চুয়াডাঙ্গার উথলিতে অবস্থান নেন। 
 
তিনি জানান, উথলির একটি শালবাগান। বিকেল ৫টা থেকে পাকিস্তানিদের সঙ্গে গুলিবিনিময় হয়। প্রচণ্ড এই লড়াইয়ে তাদের কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কমান্ডার আনোয়ারের কাছ থেকে তার দূরত্ব ছিল ৫০ গজের মতো। হঠাৎ পাকিস্তানিদের একটি গ্রেনেডের আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন কমান্ডার আনোয়ার। আর সেই সময়ই কী যেন লাগে মান্নানের মুখমণ্ডলে। কপালে, মুখের নিচে এবং দু’চোখে খুব জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপর আর কিছু মনে নেই। পরে জানতে পারেন, দর্শনার একটি গোপন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর থেকে দু’চোখে আর কিছুই দেখতে পান না। 
 
মান্নান বলেন, যখন যেখানে ছিলাম, তারা যে কাগজপত্র দিয়েছে, তা রেখে দিই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হওয়ার পর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। অনেক কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু নেই, তাই স্বীকৃতিও পাব না- এমন বিশ্বাসই ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আমার আশা জাগ্রত হয়। যাচাই বাছাইতে আমার নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও কেন যে বাদ পড়ল জানি না। অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারিনি। এরপর ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের কথা নতুন করে ভাবেন। তালিকা থেকে যারা বাদ পড়েছেন তাদের নিবন্ধনের ঘোষণা দেন। সংবাদ পেয়ে নিবন্ধন করি। যার ডিজি নং- ৫০৫৮৮। মনে হয়েছে, এবার হয়তো আমার কপালটা খুলতে পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা আর হওয়ার নয়।
 
বছর ২৫ আগে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই ছেলেমেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মাসুম বিল্লাহ (১৭) ঢাকায় দর্জির কাজ করে। সংসার চলছে স্ত্রী রাশিদা বেগমের দৈনন্দিন মজুরির উপরে। তিনি স্থানীয় একটি পানের বরজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মজুরি এক-দেড়শ’ টাকা। 
 
ইত্তেফাক/এমআই