গোবিন্দগঞ্জে শহীদ মিনারে আদিবাসী দিবসের সমাবেশ করতে বাধা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ১৭:৩৭
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের স্থানীয় শহীদ মিনারে আদিবাসী দিবসের সমাবেশ করতে বাধা দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। উপজেলা প্রশাসনের বাধার মুখে সেখানে তারা সমাবেশ করতে পারেনি।
 
দুপুরে আদিবাসী পল্লী উপজেলার মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামের সহস্রাধিক আদিবাসী সাঁওতাল ব্যানার, ফেস্টুন ও লাল পতাকায় সজ্জিত একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থল গোবিন্দগঞ্জ শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু ৮ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করার পর গোবিন্দগঞ্জ গার্লস মোড়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ তাদের বাঁধা দেয়। ফলে মিছিলকারীরা গার্লস মোড়ের সড়কের বসে পড়ে এবং সেখানেই সমাবেশ করতে বাধ্য হয়।
 
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়ন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জনউদ্যোগ যৌথভাবে এই কর্মসুচীর আয়োজন করে।
 
সমাবেশে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কের সভাপতিত্বে ওই বক্তব্য রাখেন সিপিবি জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের আহবায়ক অ্যাড. সিরাজুল ইসলাম বাবু ও সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তী, সিপিবি জেলা কমিটির সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য প্রতিভা সরকার ববি, সিপিবি উপজেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, মানবাধিকার কর্মী কাজী আব্দুল খালেক প্রমূখ।
 
বক্তারা বলেন, সাধারণত কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অণুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী।
 
আদিবাসীদের উপজাতি হিসেবে সম্বোধন করা একেবারেই অনুচিত, কারণ তারা কোন জাতির অংশ নয় যে তাদের উপজাতি বলা যাবে। বরং তারা নিজেরাই এক একটি আলাদা জাতি। এসময় বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ায় যুগে যুগে এদের অনেকে প্রান্তিকায়িত, শোষিত। যখন এসব অন্যায্য, অবিচারের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের স্বপক্ষে তারা কথা বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা দমন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।
 
বক্তারা আরো বলেন, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ বেআইনীভাবে (কোর্টের আদেশ ব্যতীত) আদিবাসীদের নির্মিত বসতবাড়ি, ফসলাদি ও মৎস্যখামারে পুলিশ, প্রশাসনসহ স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের দ্বারা উচ্ছেদের নামে নিরীহ আদিবাসীদের উপর হামলা বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বর্বরোচিতভাবে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে ও নির্যাতনে শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মারডি ও রমেশ টুডু নিহত এবং অনেকেই গুরুতর আহত হয়। গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করে।
 
এমনকি পুলিশ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে অনেককে গ্রেফতার ও নির্যাতন করে জেল হাজতে প্রেরণ করে। আদিবাসী সাঁওতালদের স্কুল তছনছ করে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারপর প্রায় ২ বছর হলো বাগদাফার্মের আদিবাসীরা বাড়ি-ঘর হারিয়ে মানববেতর জীবন যাপন করছে। তাদের সন্তানেরা ২ বছর হলো পড়াশুনা করতে পারছে না। স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয় অবহিত করা হলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
 
সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের নিরীহ আদিবাসী-বাঙালিদের উপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত এবং আখ চাষের নামে রিক্যুজিশনকৃত ১৮৪২.৩০ একর বাপ-দাদার জমিতে আদিবাসী ও প্রান্তিক বাঙালি কৃষকদের আইনগতভাবে জমি ফেরত দেয়ার দাবিসহ সাত দফা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবী জানান।
 
সমাবেশে স্থলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফিউল আলম বলেন, আদিবাসীদের দাবিগুলো পূরণের বিষয়টি সম্পূর্ণই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারণী বিষয়। তাই এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে তিনি আদিবাসীদের দাবিগুলো উচ্চ পর্যায়ে জানাবেন বলে আশ্বাস দেন।
 
ইত্তেফাক/কেআই