দেবীগঞ্জে থানা হেফাজতে যুবকের মৃত্যু, পরিবারের অভিযোগ পরিকল্পিত হত্যা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৮, ২২:৩০

পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জে থানা হেফাজতে হাসানুর রহমান মিলন (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদেহ থানা থেকে লুকিয়ে ময়নাতদন্তে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দেবীগঞ্জ থানা ঘেরাও করে। দেবীগঞ্জ চৌরাস্তায় মহাসড়ক অবরোধ করে এলাবাসী। পরিবারের অভিযোগ মিলনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে সে আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।  

সোমবার (২০ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে থানা হাজতে মিলনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২০ আগস্ট) দুপুরে বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ মাহমুদ হাসান ও দেবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এরপর পুলিশ কাউকে না দেখিয়ে না জানিয়ে থানার পেছন দিয়ে লাশ লুকিয়ে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
IMG0
থানা হাজতে যুবকের মৃত্যুর ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই এলাকার কয়েকশত বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানা ঘেরাও করে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে। এক পর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের মরদেহ না দেখিয়ে থানার পেছনের দরজা দিয়ে তা ময়নাতদন্তে পাঠানোয় এলাকাবাসী আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।

বিক্ষুব্ধরা দেবীগঞ্জ থানার মূল ফটকের সামনে পুলিশের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে এবং শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে। ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। এ ঘটনায় ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
IMG1
জানা গেছে, মিলনের বাড়ি দেবীগঞ্জ উপজেলার পৌরসভার থানাপাড়া এলাকায়। সে ওই এলাকার হবিবর রহমানের ছেলে। মিলন ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। কয়েকদিন আগে ঈদের ছুটি কাটাতে বাড়িতে আসেন তিনি। বড় ভাইয়ের শ্যালিকা কুলসুম নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে রবিবার রাতে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হলে এক পর্যায়ে বড় ভাই হাসিবুল ইসলাম মৌখিকভাবে পুলিশকে জানায়। দেবীগঞ্জ থানা পুলিশের উপপরিদর্শক আবুল কালাম রাত আড়াইটার দিকে মিলনকে থানায় নিয়ে আসেন।

পরিবারের লোকজন জানান, পারিবারিক বিবাদের কারণে অভিভাবকেরা মিলনকে রবিবার গভীর রাতে দেবীগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়। দেবীগঞ্জ থানার এসআই কালাম তাকে থানা হেফাজতে আটকে রাখে।
IMG2
সোমবার সকালে থানার টয়লেটে কম্বল দিয়ে ফাঁস লাগানো মিলনের মৃতদেহ দাঁড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেছে, সুস্থ অবস্থায় মিলনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ তাকে মেরে ফেলে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। বড় বোন বিউটি জানান, সোমবার সকালে থানা থেকে মিলনের জন্য কাপড় এবং খাবার নিয়ে আসার জন্য পরিবারকে ফোন করা হয়। ছোটবোন বিথীকে সঙ্গে নিয়ে বড় বোন বিউটি এবং অন্যরা খাবার নিয়ে থানা হাজতে গেলে মিলনকে না পেয়ে পুলিশকে জানায় তারা। এ সময় পুলিশ হাজতের বাথরুমে ঝুলন্ত লাশ দেখে তাদেরকে জানায় মিলন মারা গেছে।
IMG3
মিলনের বাবা হবিবর রহমান আরও জানান, কিছুদিন আগে করতোয়া নদীতে মাছ মারাকে কেন্দ্র করে এসআই কালামসহ কয়েকজন পুলিশের সঙ্গে মিলনের ঝগড়া বিবাদ হয়েছিল। সেই রাগেই পুলিশ আমার ছেলেকে মারতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

দেবীগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর আকসাদুল ইসলাম জানান, পরিবারের লোকজন মিলনকে গভীর রাতে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ তাকে থানা হেফাজতে রাখে। সকালে সে কিভাবে আত্মহত্যা করলো? তিনি পুলিশের এসব সাজানো নাটক উল্লেখ করে বলেন, পুলিশই তাকে হত্যা করেছে। মিলনের মামা সাদেকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ আমাদের না দেখিয়ে লাশ লুকিয়ে কেন পঞ্চগড় পাঠালো আমরা জানি না। সুরতহাল রিপোর্টের সময়ও আমাদের কাউকে রাখলো না। আমাদের লাশও দেখালো না। এটা পুলিশের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কি। পুলিশই তাকে মেরে ফেলেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। থানার টয়লেটে কোনভাবেই কম্বল দিয়ে মিলন আত্মহত্যা করতে পারে না।

অন্যদিকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা আর থানা হেফাজতে যুবকের মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশ নানা রকম বক্তব্য দিচ্ছে। পুলিশ বলছে তাকে ৬০ গ্রাম গাঁজাসহ ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। অথচ পরিবারের লোকজন গভীর রাতে দুই ভাইয়ের ঝগড়া বিবাদ এড়াতে মিলনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।

দেবীগঞ্জ থানা পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, হাসানুরকে ৬০ গ্রাম গাজাসহ রবিবার রাতে আটক করা হয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা রয়েছে।

বোদা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহমুদ হাসান প্রার্থমিক সুরতহাল সম্পন্ন করেন। তিনি জানান, থানা হাজতের বাথরুমে কম্বল পেঁচিয়ে আত্মহত্যার সুরতহাল করেছি। লাস ময়নাতদন্ত করার জন্য পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। পরবর্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিলনের পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর কারণ উদঘাটন ও ঘটনার বিচার দাবি করেছে। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানায় পরিবারের লোকজন।

ইত্তেফাক/নূহু