ঈদে নাড়ীর টানে স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হতে গিয়ে ঘরে ফেরা মানুষের চরম ভোগান্তিতে পড়াটা ছিল বিগত সময়ের স্বাভাবিক ঘটনা। এবারও ছিল একই ধরণের শঙ্কা। কিন্তু গতকাল গাড়ির চাপ বাড়লেও মহাসড়কে যানজট ছিল অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে। তবে ট্রেন ও লঞ্চে ছিল উপচেপড়া ভিড়। ঢাকার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগের প্রধান মহাসড়কগুলোয় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত যানবাহনের চাপ থাকলেও জট দেখা যায়নি। মাওয়া-কাঠালবাড়ীয়া, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটেও যানজট ছিল অনেকটা স্বাভাবিক।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড় মেঘনা-গোমতী সেতু টোলপ্লাজা এলাকা থেকে ফেনীর মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত প্রায় শত কিলোমিটার সড়কে যানজট দেখা যায়নি। ঈদের তিন দিন আগে মহাসড়কে লরি ও কভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীবাহী যানগুলো স্বস্তিতে চলতে পারছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মির্জাপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে টাঙ্গাইল এলাকায় কোথাও কোথাও মাঝে মাঝে ধীরগতি দেখা গেলেও কোথাও জট সৃষ্টি হয়নি। অনেকটাই স্বাভাবিক গতিতে চলছে সব যানবাহন। গত ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই এ এলাকায় মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। এবার সেই জট না থাকার কারণ সম্পর্কে জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক এশরাজুল হক জানিয়েছেন, পুলিশ সার্বক্ষণিক মহাসড়কে অবস্থান করছে। হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা ও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। তাছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গত কয়েক বছর ধরে চারলেন প্রকল্পের কাজ চলার কারণে জট লাগত। উত্তরবঙ্গসহ অন্তত ২৩ জেলার মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করায় এখানে চাপ বেশি। এখন চার লেনের প্রধান কাজ শেষ হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে। এছাড়া মহাসড়কের ২৩টি সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় গাড়িগুলোকে জটে পড়তে হচ্ছে না।
জেলার পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, আশা করছি এবার ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারবেন। মহাসড়কে যানজট নিরসনে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-মানিকগঞ্জ মহাসড়ক মোটামুটি ফাঁকা ছিল। তবে গতকাল দুপুরের এ সড়কে যানবাহনের চাপ কিছুটা বেড়ে যায়। আরিচা-পাটুরিয়া ফেরিঘাটে গাড়ির চাপ থাকলেও বিশেষ জট নেই। সব গাড়ি আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে ফেরিতে উঠতে পারছে। মানিকগঞ্জ বিআইডব্লিউটিসির আরিচা ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক জিল্লুর রজহমান জানিয়েছেন, শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ঘাটে নাব্য সংকটের কারণে সেখান থেকে বড় ফেরিগুলো এখানে আনা হয়েছে। এখানে এখন ১১টি রো রো ফেরিসহ মোট ২০টি ফেরি চলছে। আধা-ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে সব গাড়ি ফেরিতে উঠতে পারছে। তবে কারখানা ছুটির পর বিকাল নাগাদ চাপ বাড়তে পারে।
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানায়, গতকাল সকাল থেকেই শিমুলিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার মানুষ প্রধানত এই ঘাট ব্যবহার করেন। নাব্য সংকটে এখানে প্রায় এক সপ্তাহ ফেরি চলাচল প্রায় বন্ধ থাকলেও ড্রেজিংয়ের পর গত শনিবার মোটামুটি সচল হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের এজিএম খন্দকার শাহ খালেদ নেওয়াজ বলেন, ছোট ১৭টি ফেরি সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছে। তাছাড়া ঝুঁকি নিয়ে একটি বড় ফেরিও চালানো হচ্ছে। চাপ থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। সবাই বিশেষ সতর্ক থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া স্পিডবোট ও লঞ্চগুলোয় প্রচুর ভিড় ছিল।
বেশি ভিড় ট্রেন ও লঞ্চে
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে গতকাল ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। গতকালও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরি করে স্টেশনে এসেছে, ফলে সেগুলো ছেড়ে গেছে আরো দেরি করে। এ ব্যাপারে কমলাপুরে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী জানান, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। এ কারণে ট্রেনগুলো দেরিতে পৌঁছায়। ফলে সেগুলো ছাড়তেও দেরি করে। এ কারণে উত্তরবঙ্গের ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
অপরদিকে গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাটে যাত্রী হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই লঞ্চ ছেড়েছে। প্রতিটি লঞ্চেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। এবার ঈদযাত্রায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের সার্বিক প্রস্তুতি ভালো। ভোগান্তি ছাড়াই মানুষ যাতায়াত করছে বলে জানিয়েছেন সদরঘাটে পরিদর্শনে আসা নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ১০ আগস্ট থেকে শুরু করে অধিকাংশ মানুষ বাড়ি পৌঁছে গেছে, বর্তমানে পোশাককর্মীদের বাড়ি ফেরার বাড়তি চাপ রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যাত্রী নিরাপত্তা ও হয়রানি বন্ধে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হয়ে যাতে কোনো লঞ্চ ঘাট থেকে ছেড়ে যেতে না পারে সেদিকে কঠোর নজর রাখা হচ্ছে।
ইত্তেফাক/নূহু
