সরকারি টাকার টোপ দিয়ে গরিবদের কাছে চাঁদাবাজি

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০১:৫৫
মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা দিলে মিলবে সরকারি ১ লাখ টাকা। এমনই প্রলোভন দিয়ে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি সরকারি নগদ টাকা এনে দেয়ার কথা বলে এভাবে ‘চাঁদাবাজি’ করেছেন। কিন্তু এখন তাদের জমিতে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কারো কারো আঙ্গিনায় শুরু হয়েছে ঘর তৈরীর কাজ। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নাই তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোন টাকা নেয়ারই সুযোগ নেই। তবে এসব পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা।
 
নগদ টাকার লোভে স্থানীয় মেম্বারের হাতে দুই দফায় ৭ হাজার ৬০০ টাকা তুলে দেন পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নের ক্ষুদ্র জামিরা গ্রামের মোসাজ্জেল হকের স্ত্রী চাঁন বানু। পরে তাকে জানানো হয় টাকা নয়, তার জমিতে একটি ঘর তৈরী করে দেওয়া হবে। এটি আসলে বিনামূল্যের সরকরি ঘর।
 
চাঁন বানু জানান, স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার গিয়াস উদ্দিন ও ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মাহবুব হোসেন ঘর করার জন্য ১ লাখ টাকা দেয়ার কথা বলে তার নাম লিখে নেন। এর পর তারা ১০ হাজার টাকা চান। এ সময় ৪ হাজার ৬০০ টাকা তার বাড়িতেই ছিল। আর ৩ হাজার টাকা ধার করে নিয়ে এসে তাদের ৭ হাজার ৬০০ টাকা দিয়েছি। বাকি ২ হাজার ৪০০ টাকা দিতে না পারায় তারা কয়েক বার অপমান করেছেন বলে জানান এই দুস্থ নারী।
 
চাঁন বানুর মত একই অবস্থা গ্রামের আরো অনেকের। পাশেই দেখা গেলো, পরপর কয়েকটি বাড়ির আঙ্গিনায় চলছে ঘর নির্মাণের কাজ। কারো করো ঘর উঠছে বসতবাড়ির আঙ্গিনায়। এই ঘর অনেকের কাছেই অপ্রয়োজনীয়।
 
ক্ষুদ্র জামিরা গ্রামের সানাউল্লাহর স্ত্রী লাইলী বেগম জানান, তার ঘর আছে। যেটি অর্থ অভাবে সংস্কার করতে পারছি না। সরকার ঘর করার জন্য এক লাখ টাকা করে দেবে এমন লোভ দিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার ৬০০ টাকা নিয়েছেন স্থানীয় মেম্বার। মনে করেছিলাম সে টাকা দিয়ে বাড়ি সংস্কার করবো। কিন্তু পরে দেখি সরকারি টাকায় ঘর করে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, তসলেমের স্ত্রী সুকজানের কাছ থেকে ৯ হাজার ৬০০, তারিকুলের কাছ থেকে ১০ হাজার ৬০০, রঞ্জুর স্ত্রী জুতির কাছ থেকে ৫ হাজার, বাবর উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের কাছ থেকে ১০ হাজার ৬০০ এভাবে বহু গরীব মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে। বরাদ্দ নিয়ে আসার জন্য ‘কাগজপত্র তৈরী’ ও ‘কর্মকর্তাদের দেয়ার’ নাম করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বাররা এই টাকা নিয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন।
 
বেলপুকুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বদি বলেন, তার ইউনিয়নে বরাদ্দ এসেছে ১৮৮টি ঘর। এর তালিকা তৈরী করেছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার গিয়াস উদ্দিন ও ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মাহবুব হোসেন। তারাই তালিকা জমা দিয়েছেন। সে তালিকা আমাকে তারা দেখায়ও নি। আমিও শুনেছি প্রায় সবার কাছ থেকে গড়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে।
 
তবে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মাহাবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু তালিকা প্রস্তুত করে স্থানীয় এমপির কাছে দিয়েছি।’ আর ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘টাকা নেয়ার অভিযোগ সত্য নয়। এটা আমার বিরুদ্ধে বিরোধীদের অপপ্রচার।’
 
পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, সরকারের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ৩০৪টি ঘর নির্মাণের বরাদ্দ এসেছে। এর মধ্যে বেলপুকুর ইউনিয়নে ১৮৮টি, বানেশ্বর ইউনিয়নে ৫৫টি ও জিউপাড়া ইউনিয়নে ৬১টি। প্রতিটি ঘর নির্মাণের জন্য ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ এসেছে। গত ১১ জুন প্রকল্প পরিচালক এ বরাদ্দ অনুমোদন করেন। ইতিমধ্যেই এসব ঘর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘ ঘরের নামে এসব দুঃস্থ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ তার কাছে এসেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমান হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে’।