রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের খিলক্ষেত এলাকা থেকে এসেছেন মাহমুদুর রহমান শিহাব, মাসুম, জগলুল। বাংলাদেশের খেলা দেখবেন। দুপুরেই ট্র্যাফিক জ্যাম পার হয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় এসে টিকিট সংগ্রহ করেছেন। ভিআইপি গ্যালারি পছন্দ নয়। সাধারণ গ্যালারির টিকিট নিয়েছেন। নিজেদের দেশকে সমর্থন করবেন।
শিহাব হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার। মা মনোয়ারা বেগম চন্দনার স্বপ্ন ছিল সন্তানকে ক্রিকেটার বানাবেন। মোহামেডানে খেলবে। সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। কিন্তু খেলাটা যেন আজও বুনে রেখেছেন মনের মধ্যে। দেশের মাঠে সাফের খেলা।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল লড়াই। চর্মচক্ষে দেখার সুযোগ কেন হারাবেন। ফুটবলের জার্সি গায়ে ঘর্মান্ত শিহাব টিকিট হাতে ছুটলেন গ্যালারির দিকে। শিহাব, মাসুমদের মতো অনেক তরুণের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তখনও প্রথম খেলায় মাঠে নামেনি নেপাল-পাকিস্তান। তার আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে দর্শক সাড়া পড়ে গেল।
আশংকা ছিল প্রথম দিনের দর্শক সমাগম নিয়ে। ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে সময় মত পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে যে শহরে সেখানে আশংকা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা হয়নি। ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলেঠুলে সাফের খেলা দেখতে দর্শক এলেন।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে সেই ২০১৬ সালে ভুটানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখেছিলেন দর্শক। আবার অনেক দিন পর খেলা মাঠে গড়ালো। নারী- পুরুষ দর্শক আগ্রহ উপচে পড়ল।
জার্মানি থেকেও দুজন দর্শক এসেছেন। কথা বলতে গেলে এড়িয়ে যান তারা। শুধু বললেন আমরা ইন্টারনেটে জেনেছি দুই বছর পর পর সাফ খেলাটা হয়। আমাদের সাংবাদিক কার্ড আছে। দুপুরের তীব্র গরম উপলক্ষে করেই স্টেডিয়ামে ঢুকতে শুরু করে দর্শক। স্টেডিয়াম মার্কেট বন্ধ রাখা হয় নিরাপত্তার কারণে। প্রতিটি গেটে আর্চওয়ে বসানো হয়েছে।
অনেক দিন পর খেলা তাইতো কালোবাজারিরাও হুমড়ি খেয়ে পড়লেন টিকিট বিক্রিতে। ২০ টাকা গ্যালারির টিকিট মূল্য। বিদেশি সমর্থকরাও ছুটলেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। নেপাল, মালদ্বীপ, পাকিস্তানি সমর্থকরা ভিড় করলেন। বাংলাদেশে অবস্থানকারী নেপাল, মালদ্বীপের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে ভিড় করেছেন।
ভুটানের বিপক্ষে সেই ২০১৬ সালে খেলেছিল বাংলাদেশ। আবার সেই ভুটানের বিপক্ষেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ফুটবল মঞ্চে দেখা দুই দেশের। ফুটবল অনুরাগীদের উচ্ছ্বাস আবেগ উপচে পড়ল। ফুটবলের চিরচেনা সেই ছবিগুলোর দেখা মিলল। আবাহনীর গ্যালারিতে আসরের নামাজ আদায়ে মুসল্লিদের সমাবেশ।
দর্শক কণ্ঠে ফুটবল নিয়ে আবার গুঞ্জন। আন্তর্জাতিক ফুটবল লড়াইয়ের কোথায় কোথায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। কেন উপরে উঠে আসতে পারছে না। কেন গত তিন সাফে বাংলাদেশ গ্রুপ পর্ব হতে বিদায় নিল। সংগঠকদের দুর্বলতা।
বাফুফের সফলতা ব্যর্থতা সবই বিনা বাধায় উঠে আসল চায়ের টেবিলে ঝড় তোলার মতই। দেশি খেলোয়াড়দের সমালোচনাও করেছেন দর্শক। বর্তমান খেলোয়াড়দের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। যে পরিমাণ অর্থ পায়, সে অনুযায়ী খেলা দেখাতে পারে না দেশিরা। খেলার চেয়ে পারিশ্রমিকের প্রতি নজর বেশি। পুরান ঢাকার রফিকউদ্দিন।
অনেক দিন ধরে দেশের ফুটবল দেখছেন। কিন্তু এমন মানহীন ফুটবলারদের খেলা দেখেননি। গালে আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে বলছিলেন, ‘কি কমু। এহনকার পিলারগো মত খেলা জীবনে দেহি নাই। আসলাম, কায়ছার হামিদগো খেলা অহনও মনে আছে। আর এহনকার পিলিয়ারগো নামও কইতে পারি না।’
বলতে বলতে শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশ ভুটানের খেলা। খেলোয়াড়দের সমালোচনা ভুলে গিয়ে সব দর্শক মাঠের ফুটবলারদের প্রেমে পড়ে গেলেন। সমর্থন দিতে লাগলেন গলা ফাটিয়ে। দর্শক প্রাণে ফুটল ফুটবলের স্পন্দন।
ইত্তেফাক/কেআই
