জনস্বার্থমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং আইন পেশায় দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম ‘এশিয়া ২১ ইয়াং লিডার-২০১৮’ মনোনীত হয়েছেন। এশিয়া সোসাইটি এবার নতুন প্রজšে§র নেতৃত্বদানকারী বিভিন্ন সেক্টরের মোট ৩১ জনকে ইয়াং লিডার হিসেবে নির্বাচিত করে। গত শনিবার এশিয়া সোসাইটির ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। রাশনা ইমাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ ল ফার্ম আকতার ইমাম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটের ম্যানেজিং পার্টনার। তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন সফলতা, অর্জন ও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের তরুণদের অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন ‘প্রজন্ম-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রিয়াদ খন্দকার
স্বীকৃতি অর্জনের অনুভূতি : এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের তরুণ নেতাদের সবচেয়ে শক্তিশালী এই প্লাটফর্মে নিজেকে দেখতে পারার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রাশনা ইমাম বলেন, ‘এটি আসলেই অনেক ভালোলাগার মতো একটি ব্যাপার। এ বছর বাংলাদেশি হিসেবে শুধুমাত্র আমি মনোনীত হলেও এই প্লাটফর্মে বাঙালিদের পদচারণা কিন্তু ঘটেছে অনেক আগেই। আইনি পেশা থেকে এর আগে মনোনীত হয়েছিলেন ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন ও আনিতা গাজী ইসলাম। এশিয়া ইয়াং লিডারসের মতো শক্তিশালী একটি প্লাটফর্মে বাঙালিদের এই ধারাবাহিক অর্জন সত্যিই বেশ প্রশংসার দাবিদার। তাই ব্যক্তিগত ভালোলাগার পরিমাণটাও খানিকটা বেশি।’
যে কার্যক্রমের ফলাফলে এই স্বীকৃতি : আমাদের দেশে যেসব সেকেলে ও বৈষম্যমূলক আইন রয়েছে, সেগুলো নিয়েই গত কয়েকবছর ধরে রাশনা ইমাম কাজ করে আসছেন। বেশ কয়েকটা জনস্বার্থমূলক মামলা নিয়ে লড়েছেন এবং লড়ছেন। আর এই কার্যক্রমগুলোতে সাফল্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার স্বীকৃতিস্বরূপ এশিয়া ইয়াং লিডার-২০১৮ মর্যাদা লাভ করেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জনস্বার্থমূলক মামলা হলোÑ
আমাদের দেশে অবৈধ কিডনি বেচাকেনার বেশ বড়সড় একটি মার্কেট রয়েছে। টাকার অভাবে অশিক্ষিত মানুষজন কিডনি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এছাড়াও এই অবৈধ বেচাকেনায় সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ২০১৭ সালে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের তিনটি ধারা কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। আদালতে রিট পিটিশনারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী রাশনা ইমাম। বর্তমানে এটি বিচারাধীন আছে এবং রুল ইস্যু করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি এয়ারপোর্ট রোডে আরাফাত নামের এক তরুণ বাসে উঠতে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। ওই সময় সামাজিক উদ্ভাবনী সংগঠন ‘তরু’র প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কামাল নিজের গাড়িতে করে তাকে নিকটস্থ তিনটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানায় কৃর্তপক্ষ। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশের সহায়তায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ছেলেটিকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও সাইফ কামাল জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রাশনা ইমাম। অতঃপর এই বছরের আগস্ট মাসে মামলাটির জাজমেন্ট আসে। এ প্রসঙ্গে রাশনা ইমাম বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ ও সহায়তাকারীর সুরক্ষা প্রদান নীতিমালা-২০১৮ গেজেট করা হয়। এবং এতে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি স্বাস্থ্য সেবা দিতে প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল বাধ্য।’
গত ৯ আগস্ট ‘স্বদেশ’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে জনস্বার্থে হাইকোর্টে করা রিটের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী রাশনা ইমাম। পরবর্তীতে গত ১৪ আগস্ট ঢাকা শহরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে আগামী তিন মাসের মধ্যে তার তালিকা আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রশ্নে রুল জারি করেন।
IMG0
আইন পেশাকেই কেন বেছে নিলেন : স্বনামধন্য আইনজীবী ব্যরিস্টার আখতার ইমাম শুধু বাবাই নন, আইন পেশায় মেয়ে রাশনা ইমামের সিনিয়রও তিনি। এই পেশার প্রতি বাবার শ্রদ্ধা ও আনুগত্যই মেয়েকে অনুপ্রাণিত করেছিল বাবার পথে হাঁটতে। তবে পেশা নির্বাচনে পরিবার থেকে পেয়েছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাঝখানে একবার মনে হয়েছিল ডাক্তারি পড়ব। আবার ভালোলাগার ক্ষেত্র ছিল পাবলিক স্পিকিং আর ডিবেটিং। ছোটবেলা থেকেই ভিতরে একটা আÍবিশ্বাস ছিল, হয়তো আইন পেশাতেই আমি সবচেয়ে বেশি সফল হতে পারব। তাই সবকিছু মিলিয়ে বেছে নিলাম আইন পেশাকেই।’
পড়াশোনার দিনগুলো : রাশনা ইমাম ২০০২ সালে এলএলবি সম্পন্ন করেন ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বাকিংহাম থেকে। ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে এলএলবি শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে এলএলএম করেন তিনি। একই বছর ইংল্যান্ডের ইন’স অব কোর্ট স্কুল অব ল থেকে ব্যারিস্টারি কোর্স করেন। তারপর দেশে ফিরে কয়েক বছর বাবার সাথে প্র্যাকটিস করেন। এর মধ্যেই তিনি আবেদন করেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ব্যাচেলর অব সিভিল ল (বিসিএল) ডিগ্রির জন্য। ২০০৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিসিএল ডিগ্রি নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ল’ ফার্ম বেকার অ্যান্ড মেকাঞ্জির লন্ডন অফিসে যোগ দেন রাশনা ইমাম। সেখানে কর্মরত অবস্থায় কোম্পানি ও বাণিজ্যিক আইন বিষয়ে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দেশকে সেবা দেওয়ার নৈতিক দায়িত্বের টানে এত বড় সুযোগ উপেক্ষা করে পরবর্তীতে ২০০৯ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
কোর্টে প্রথম দিনের শুনানির স্মৃতি : স্মৃতিরোমন্থন করে রাশনা ইমাম বলেন, ‘আমার প্রথম শুনানি ছিল বিচারপতি শামীম হাসনাইনের কোর্টে। অনেক স্ট্রিক্ট একজন জাজ হওয়ায় সবাই বেশ ভয় পেতেন তাকে। ভয়ের কারণে আমি আগে থেকেই বেশ প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলাম। তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি। জাজ আমার পুরো বক্তব্য শুনেছিলেন এবং শোনার পর আবেদনটা মঞ্জুর হয়। কিন্তু এই আনন্দে উল্লসিত হয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। যদিওবা আমার দাঁড়ানোর কথা ছিল না তখন। সে সময় জাজ আমাকে খানিকটা বকা দিয়েছিলেন।’
বর্তমান তরুণদের সম্পর্কে মূল্যায়ন : এ প্রসঙ্গে রাশনা ইমাম বলেন, ‘বর্তমান তরুণরা আগের চেয়ে অনেক উদ্যমী। তারা প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর নেশায় ছুটছে, ভালো কাজ করছে। দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বটা সম্পর্কেও তারা বেশ সচেতন। আমরা যে শুধু নিতে আসিনি, দিতেও এসেছি-এই ধারণাটা সবার মাঝে জন্ম নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের উচিত সিস্টেমকে দোষারোপ না করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। পড়াশোনা ঠিক রেখেই তাদের গণ্ডিটা ধীরে ধীরে বড় করতে হবে।’
আইনি পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ : ‘আইনি পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় খানিকটা বেশি। তবে আমাদের দেশের নারীদের আরও অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।’ এমনটাই মনে করেন রাশনা ইমাম। সিনিয়র জাজদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। তবে আমাদের কোর্টগুলোতেও একটি নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আমার আরেকটি অনুপ্রেরণা ছিল আমাদের এই পেশায় নারীরা সংখ্যায় অনেক কম। আমি চেয়েছিলাম আমাকে দেখে কেউ অনুপ্রাণিত হোক। পরবর্তীতে তাদের দেখে আরও অন্য কেউ অনুপ্রাণিত হবে। শুরুটা করতে হবে এভাবেই।’
IMG1
পেশা ও ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয় : ২০০৬ সালে অক্সফোর্ডে পড়ার সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ-এর ছাত্র ও বর্তমান রাজনীতিবিদ ববি হাজ্জাজের সঙ্গে পরিচয় হয় রাশনা ইমামের। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন দুজন। বর্তমানে দুই কন্যা সন্তানের জননী রাশনা ইমাম নিজের পেশা ও ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক্ষেত্রে জীবনসঙ্গীর ভূমিকা আসলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম থেকেই আমাদের মধ্যে একটা ভালো বোঝাপোড়া তৈরি হয়েছিল। আমরা দুজন দুজনকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট করে থাকি। কাজের ক্ষেত্রেই আমাদের মধ্যে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই, সেটা ঘরে হোক বা বাইরে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : আইন পেশাতে থাকার পাশাপাশি জনস্বার্থমূলক মামলাগুলোর দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে চান রাশনা ইমাম। এশিয়া ইয়াং লিডার প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে চান রাশনা ইমাম। তিনি বলেন, ‘তালিকা ঘোষণা হলেও আগামী নভেম্বরে ম্যানিলাতে একটি অনুষ্ঠান হবে, সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদেরকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আমাদের দেশে বেশ কিছু বৈষম্যমূলক আইন রয়েছে। সেগুলোর পরিবর্তন দরকার। সেক্ষেত্রে ‘এশিয়া ইয়াং লিডার-২০১৮’-এর স্বীকৃতি আরও সহযোগী হবে।’
প্রসঙ্গত, ১৯৫৬ সালে জন ডি রকফেলার তৃতীয় এশিয়া সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এশিয়া এবং আমেরিকার সাধারণ জনগণ, নেতা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার সম্পর্ককে মজবুত করার লক্ষ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে থাকে। সে অনুসারে এটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের তরুণ নেতাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্লাটফর্ম, যাদের ৪০টি দেশে প্রায় ৯০০ জন প্রভাবশালী অ্যালামনাই রয়েছে।
ইত্তেফাক/আরকে/ইএইচএম
